মিনিমামলিজম
এই ধারণাটি বিগত কয়েক বছরে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং এর যথেষ্ট কারণও আছে. এই পুরো ব্যাপারটা কি? সেটাকে সঙ্গায়িত করা যায় এভাবে যে, মিনিমালিজম হচ্ছে যা আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সেগুলোকে ধারণ করা এবং বাকি সব কিছু যা আমাদের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয় সেগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করা। অর্থাৎ কোন কোন বিষয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন জিনিসগুলোকে আমাদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সেই সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা থাকা এবং বাকি সব ত্যাগ করে দেয়. সেগুলো নিয়েই জীবন ধারণ করা. কিন্তু এমন সংজ্ঞায়ন সত্ত্বেও minimalism কোন ধরাবাধা জীবন ব্যবস্থা নয় বা মিনিমালিস্ট হতে হলে কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে চলতে হবে এরকমটিও কিন্তু নয়. মিনিমালিস্ট লাইফ স্টাইল এমন একটি বিষয় যা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য স্বতন্ত্র। এক্ষেত্রে মূল বিষয়টি হচ্ছে সত্যিকার অর্থে কোন কোন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সেই সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা নিয়ে সেই অনুযায়ী জীবন ধারণ করা. প্রিয় দর্শক চলুন দেখি মিনিমালিজম কিভাবে আপনার জীবনধারা বদলে দিতে পারে।
মিনিমালিস্ট জীবন অবশ্যই ইচ্ছাকৃতভাবে বেছে নিতে হবে এবং তা হতে হবে স্বচ্ছ, নির্মম এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ. কারণ যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন চিন্তাভাবনা, ধ্যান , ধারণা স্বতন্ত্র এর জন্য প্রয়োজন নিজের গভীরে প্রবেশ করা এবং প্রথমে নিজের প্যাশন এবং কি গুরুত্বপূর্ণ তা খুঁজে বের করা। মিনিমালিজম লাইফ লিখে যদি আপনি গুগোলে সার্চ করেন তাহলে দেখা যায় সুন্দর গোছানো পরিপাটি ঘরের ছবি. একটা খাট, একটা টেবিল, পাশে একটা ফুলের টপ. রান্নাঘরে মাত্র কয়েকটা ক্রুকে কেস. কাপড়ের আলমারিতে হাতে গোনা কয়েকটা কাপড়. সবকিছু ঝকঝকে পরিপাটি। আসলে এই মিনিমালিজম জীবন মানে আরো অনেক কিছু জীবন থেকে পরিপাটি করা. যেমন আমাদের ফেসবুকে বন্ধুদের সংখ্যা তিন হাজার প্লাস. সঠিক মানুষগুলোকে চিনে নেয়া বাকিগুলোকে ডিলিট করে দেওয়া. মিনিমালিজম দিতে পারে আপনাকে বস্তুগত জীবন থেকে মুক্তি.
আধুনিক জীবন এবং সংস্কৃতি আমাদের শিখিয়েছে যে বস্তুগত সম্পদ অধিকার করার মাঝেই সমস্ত সুখ নিহিত এবং যত বেশি বস্তুগত সম্পদ অধিকার করবো জীবন হবে তত সুখের। আমাদের শেখানো হয়েছে যে যত বেশি অর্জন করা যায় ততই ভালো এবং বিজ্ঞাপনগুলো এই ধরনের প্রচার করছে যে সুখ এখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কিনতে পাওয়া যায় ।
কিন্তু এই ধারণা নিঃসন্দেহে ভুল মিনিমালিস্ট জীবন বস্তুগত সম্পদ অধিকার করার এই সর্বগ্রাসী চেতনা থেকে মুক্তি দেন। ভোগবাদের এই যান্ত্রিক জীবন থেকে সরে এসে অন্য কোথাও সুখ খোঁজার জন্য সাহস যোগায়. মেনিম্যালিজম গুরুত্ব দেয় সম্পর্ককে, অভিজ্ঞতাকে এবং অবশ্যই আত্মিক যত্নকে. এটা আমাদের দেখায় যে আমরা ইতিমধ্যে যা অধিকার করেছি তাই যথেষ্ট । minimalism আমাদের কৃতজ্ঞ হতে শেখায় এবং এর মাধ্যমে আমরা স্বল্পের মধ্যেই প্রাচুর্যতা খুঁজে পাই. মিনিমালিজম আধুনিক জীবনের উন্মাদনা থেকে মুক্তি দেয়. আধুনিক জীবন প্রচন্ড গতিময়।
আমরা সবসময় একটা কেমন যেন তারার মধ্যে থাকি সবকিছু দ্রুত চাই এবং সারাক্ষণ মানসিক পীড়ন ভোগ করি. বিভিন্ন রকমের বিল ট্যাক্স এসব প্রদানের জন্য আমাদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়. কিন্তু এরপরেও দিন দিন আমাদের ঋণ বাড়তেই থাকে. আমরা ক্রমাগত এক কাজ থেকে আর এক কাজে ছুটে যাই. এমনকি রাস্তায়ও কাজ নিয়ে থাকি। তারপর আমাদের কাজ কখনই শেষ হয় না. সারাক্ষণ আমরা একে অপরের সাথে ফোনে যোগাযোগ করতে থাকি. কিন্তু সত্যিকারের সম্পর্ক যা জীবনকে সুন্দর করে তুলবে তার দেখা কখনোই পাইনি. কিন্তু মিনিমালিজম জীবনের এই দুর্বিষহ গতিময়তা থেকে মুক্তি আনে এবং আধুনিক জীবনের এই উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেয়. এটা আমাদের দেখায় যে অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো না করার স্বাধীনতা আমাদের আছে এবং শুধুমাত্র যার নিতান্তই প্রয়োজনীয়. সেগুলো নিয়ে জীবনধারণ করতে শেখায়. ইচ্ছাকৃতভাবে না হলেও আধুনিক জীবন বেশিরভাগ মানুষকে বাধ্য করেছে একটা ছলনাময় জীবনযাপনে. তারা তাদের পরিবারের সাথে থাকে একভাবে. কর্মক্ষেত্রে তাদের সহকর্মীদের সাথে আরেকভাবে. আবার প্রতিবেশীদের সাথে দেখা যায় একেবারে অন্য একটা রূপে। যেই জীবন তারা বেছে নিয়েছে সে জীবন তাদের বাধ্য করে একটা বাহ্যিক রূপ তৈরি করতে যা অবস্থার সাথে সাথে বারবার পরিবর্তন করতে হয়. অন্যদিকে minimalism আমাদের শেখায় একটা দৃঢ় এবং অটল জীবন ও চরিত্র তৈরি করতে । যা যে কোন অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ. একজন মিনিমাম লিস্টের চরিত্র শুক্রবার ছুটির দিনে যেরকম রবিবার কর্মক্ষেত্রে ঠিক একই রকম. এই ধরনের চরিত্র নির্ভরযোগ্য এবং স্বস্তির। একজন মিনিমাম লিস্টের চরিত্র সকল ক্ষেত্রে একই রকম এবং তার জীবন. সৎ, স্বচ্ছ এবং নির্মল.
কাউন্টার কালচার বলতে বোঝায় মূল ধারার সংস্কৃতির বিপরীতে অন্য আর এক ধারার সংস্কৃতির সৃষ্টি করা. আমরা বর্তমানে এমন এক যুগে বাস করি যেখানে সেলিব্রিটিদের বলতে গেলে উপাসনা করা হয় । দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন টিভি, রেডিও সর্বত্র তাদের পথচারণা এবং তাদের জীবনকে দেখানো হয় আধুনিক জীবনের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে. এর ফলাফল হিসেবে সাধারণ মানুষ অন্ধভাবে তাদের ভোগবাদী জীবনযাপন অনুকরণের চেষ্টা করে.
মিনিমালিস্ট হওয়া কোন অসম্ভব বিষয় বা ইউটুপিয়ান কল্পনা নয়. সম্পূর্ণভাবে অর্জনীয়. অনেক ব্যক্তি এবং পরিবার এর জীবন্ত উদাহরণ যারা সকল রকম বাহ্যিক চাকচিক্য ত্যাগ করে খুব সাধারণ একটা বাসায় অতি সাধারণ জীবন যাপন করছে. তাদের অনেককেই জিজ্ঞেস করে জানা গেছে যে তারা এই জীবনে সন্তুষ্ট এবং তাদের পূর্বের জীবনে আর ফিরে যেতে চান না. বর্তমানের জন্য মিনিমাম জীবন বেছে নেওয়া উত্তম সময়. কারণ এই একটা গ্যাজেট ফোন আমাদের অনেকটা সময় কেড়ে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত. এর ওর জীবন দেখে নিজের সাথে তুলনা করে আমরা অস্থির হয়ে পড়ছি. শুধু তাই নয়, হতাশার মতো ভয়াবহ রূপ আমাদের ভেতর দানা বাঁধছে.
মিনিমালিজম সম্পর্কে মানুষের কিছু ভুল ধারণা রয়েছে যেগুলো উল্লেখ করা প্রয়োজন. অনেকের ধারণা মিনিমারিজম হচ্ছে সবকিছু ত্যাগ করার ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবে মিনিমালিজম মানে সবকিছু ত্যাগ করা নয় বরং শুধুমাত্র যা জীবনে মূল্যবান এবং প্রয়োজনীয় শুধুমাত্র সেগুলোই ধারণ করা. দুটি ব্যাপার কাছাকাছি মনে হলেও পার্থক্যটা কিন্তু একেবারে ভিত্তিগত. আবার অনেকে মনে করেন মিনিমালিজমে অনেক রকম নিষেধাজ্ঞা আছে যে জীবনকে আরো কঠিন করে তোলে. আগে যেমন বলা হয়েছে মিনিমালিজমের কোনো ধরাবাধা নিয়ম বা মানদণ্ড নেই । মিনিমালিজম মানে এও না যে কোনো ধরণের শখ বা কোনো কিছুর সংগ্রহের অভ্যাস দেখা যাবে না । যা অনেকেই ধরে নেন। এমনকি অনেকে এরকমও মনে করেন যে সন্তান, সন্তানাদি থাকলে মিনিমালিস্ট জীবনধারণ সম্ভব না. এটা ঠিক যে পারিবারিকভাবে মিনিমালিস্ট জীবন ধারণ এবং একাকে মিনিমালিস্ট জীবন ধারণের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে. কিন্তু উভয়ই সমানভাবে সম্ভব এবং কিছু ক্ষেত্রে সন্তানদের মিনিমালিস্ট জীবন ধারণ শেখানো বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ । ক্রিয়েটিভ মানুষদের যত সিম্পল থাকা যায় ততই ভালো। কমপ্লেক্সিটি আসলে অন্যান্য বিষয় নিয়ে চিন্তা করতেই সময়গুলো পার হয়ে যায় ভালো কিছু নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ তখন আর থাকে না। আধুনিক জীবন নিঃসন্দেহে নানাবিধ জটিলতায় পরিপূর্ণ.
কিন্তু একটু চিন্তা করলেই দেখা যায় যে এই সকল জটিলতা প্রাকৃতিক নয় বরং এই ভোগবাদী আধুনিক জীবনের সৃষ্ট সমস্যা এবং এগুলো চেষ্টা করলেই পরিত্যাগ করা যায়. মিনিমালিস্ট জীবন পদ্ধতি সেক্ষেত্রে আমাদের অনেকটাই সাহায্য করতে পারে । আপনার ধ্যান ধারণা, জীবন, চেতনা, সবকিছু বদলে দিতে পারে মিনিমালিজম. আপনার বাসস্থানকে করে তুলে আরো শৈল্পিক. আপনার পরিবারের জন্য দেবে আরো বেশি সময়. থাকবেন চিন্তা মুক্ত. সাজানো, গোছানো ও নির্মলতাই মিনিমালিজমের প্রধান বিষয়. আজ এই পর্যন্তই প্রিয় দর্শক । ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন