আপনি ঠিক কখন ইঁদুর দৌড়ে যোগ দিয়েছেন এটা হিসাব করা কঠিন. কিন্তু নিশ্চিত থাকুন আপনি এই দৌড়ে আছেন. ক্লাস eight এ পড়ার সময়ের কথা মনে আছে? সামনে বৃত্তি পরীক্ষা পাটিগণিত বীজগণিতের অংক প্যাঁচ লাগাচ্ছে বিজ্ঞানের জটিল সব সূত্র ভোরে ওঠে প্রাইভেট টিউটরের বাসায় ছোটা রাত জেগে পড়াশোনা. বয়সের তুলনায় অনেক বেশি কর্ম ব্যস্ত একটা সময় নিশ্চয়ই কাটিয়েছেন তখন? আমরা সবাই কাটিয়েছি. সেই সময় নিশ্চয়ই অভিভাবক বলেছে এই তো আর কটা দিন. বৃত্তি পরীক্ষা শেষ হলেই জীবন শান্তি আর শান্তি. জীবনের নানা এপিসোডে আপনি এই কথাগুলো শুনেছেন অনেকবার অনেকের মুখে. এসএসসি পরীক্ষাটা দাও, কলেজে উঠলেই তো স্বাধীনতা. একবার ভার্সেটিতে উঠতে পারলেই জীবন হবে আনন্দে ভরপুর. একবার জব লাইফে ঢোকো. নিজের টাকায় আয়েশ করার মজাই অন্যরকম. শুনেছেন না এসব?
বয়স ঘড়ির ত্রিশের প্রান্তে দাঁড়িয়ে হিসেবগুলো মেলাতে পারেন কি? কি মনে হয়? এই এপিসোডগুলোর কোনোটা পার হবার সময় জীবন খানিকটা হলেও সহজ হয়েছে? সুন্দর হয়েছে? হয়নি, হবেও না, মিথ্যা একটা মরীচিকার আশায় আমরা ছুটেছি ঠিকই আমাদের ছোটানো হয়েছে, কিন্তু হিসাব মেলেনি ছুটতে ছুটতে ধরতে পারেনি সুখ কেউই. কারণ ওই যে বললাম. আপনি আছেন ইঁদুর দৌড়ে. ইঁদুর দৌড় মূলত অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে এই শব্দটার ব্যবহার হলেও এর বিস্তার কিন্তু সুদূরপ্রসারী. উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে অন্ধের মতো ছুটে চলা বোঝাতেই ব্যবহৃত হয় এই টার্ম. মানুষ হলেও আমরা সবাই নেশার মতো অন্ধ হয়ে ছুটছি সফলতার পিছনে. মানব জীবনের সাথে রেট রেস ট্রামটির ব্যবহারও ঠিক এই কারণেই. বিশ্ব বিখ্যাত পপ গায়ক মাইকেল জ্যাকসন যখন দু-হাজার-নয় সালে অপ্রত্যাশিত ভাবে মারা যান তখন তার কমপক্ষে ঋণ ছিল চারশো মিলিয়ন ডলার. তার বিখ্যাত বাসা নেভালেন বিক্রির কথাও চলছিল তখন। বিপুল পরিমান খরচের জন্য জ্যাকসনের প্রচুর ঋণ নেওয়ার দরকার হতো যার অধিকাংশই তিনি ফেরত দেননি. জ্যাকসনের অর্থ সমস্যা আরো খারাপ হয়ে যায় যখন তিনি অনেক ব্যয়বহুল মামলায় জড়িয়ে পড়েন এবং তার ঋণের সুদ বেড়ে যায়। সেই মাইকেল জ্যাকসন যিনি জীবনে দুহাত ভরে কামাই করেছেন সেই লোকটা কিনা মাথার উপর চারশো মিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা নিয়ে মারা গেল । অবাক লাগছে না।
মাইকেলের এই ঘটনা থেকে খুব জরুরী একটা বিষয় শেখার আছে আর সেটা হচ্ছে মানি ম্যানেজমেন্ট। মাইকেল ছিলেন মহা তারকা কেরিয়ার যে কয় বছর দীর্ঘ হয়েছিল তিনি দুহাতে টাকা কামিয়েছেন । কিন্তু সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তার খরচের তালিকাও। মাইকেল উদয়স্ত পরিশ্রম করে টাকা কামিয়েছেন ঠিকই সেই টাকা রাখতে পারেননি। পকেটের ছিদ্র দিয়ে সেটা চলে গেছে বাহারি খরচের নোনা জলে ভেসে. আপনি আমি আমি আমরা কেউই মাইকেল জ্যাকসনের মতো টাকার সাগরে শুয়ে থাকা মানুষ নই. আমরা নিতান্তই ছাপোষার লোকজন. সংগ্রাম করে টাকা কামাই জীবনধারণ করি. কিন্তু ভেবে দেখুন তো তার চেয়ে আমাদের জীবনটা কি খুব আলাদা. এই যে মাসে অল্প কিছু টাকা আমরা আয় করছি বিশ, তিরিশ, পঞ্চাশ হাজার. অঙ্কটা যাই হোক না কেন তার কতটুকু নিজের কাছে রাখতে পারছি আমরা. প্রতি মাসের বেতনটা যখন একাউন্টে ঢোকে, মোবাইলে সেই মেসেজটা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন. নাকি আসছে তিরিশটা দিন এই টাকায় কিভাবে সব ম্যানেজ করবেন এই দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়বে. প্রশ্নটার উত্তর? ভাবতে থাকুন.
আমরা পরিশ্রম করি. কারণ আমরা জীবনে সফল হতে চাই, সুখী হতে চাই, চাই, আর্থিক নিরাপত্তা. আজ একটা কোম্পানিতে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যেই ছেলে বা মেয়েটা চাকরিতে ঢুকেছে সে চাইবে দু বছরের মধ্যে অফিসার হতে তারপর নিজের দক্ষতা প্রমাণ করে সিনিয়র অফিসার , এক্সিকিউটিভ অফিসার, ম্যানেজার একটার পর একটা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে। কোম্পানি যদি তার পরিশ্রমের মূল্যায়ন না করে তাহলে সে অন্য কোথাও চাকরি নেবে। তারপর সেই এক চক্র অনুসরণ করবে. নয়টা থেকে ছয়টা পর্যন্ত নিজেকে উজাড় করে দিয়ে খাটবে. বিনিময় ভালো একটা বেতন আশা করবে. এমনটাই তো হয় সবসময়. তাই না? দরিদ্র মানুষজনের কথা বাদই দিলাম। একটু ভালো অঙ্কের টাকা যারা আয় করেন বা চড়া বেতনে যারা চাকরি করেন তাদের কি উদাহরণ হিসেবে ধরি. আপনার বেতন ত্রিশ হাজার টাকা হলে সেই অনুযায়ী আপনি নিজের লাইফ স্টাইল সাজাবেন. আপনি দৈনন্দিন কাজ থেকে মাসের বাজার, শখের কেনাকাটা সবকিছুই ওই ত্রিশ হাজার টাকা বাজেটের মধ্যেই সেরে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করবেন.
এখন হুট করে আপনার ইনকাম যদি মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা হয়ে যায় । তিরিশ হাজার টাকা সেই লিভিং স্ট্যান্ডার্ডে আপনি কিন্তু আর থাকবেন না. আরেকটু বড় একটা বাসা নেবেন. বাসে ঝুলে অফিসে যাওয়ার বদলে হয়তো কিস্তিতে একটা বাইক কিনবেন. অর্থাৎ আপনার ইনকাম যেমন বেড়েছে. পাল্লা দিয়ে খরচও কিন্তু সেভাবেই বাড়ছে. সঞ্চয়ের সুযোগটা থাকছেই না. বা টাকাটা যে কোথাও ইনভেস্ট করে সেটাকে বাড়ানোর চেষ্টা করবেন সেটাও পারবেন না.
এখন ধরা যাক দুই বছর পর আপনার বেতন বেড়ে এক লাখ টাকা হল. কি ভাবছেন? এবার টাকা পয়সা জমাবেন বা বাড়তি টাকা দিয়ে প্রোডাক্টিভ কিছু করবেন. সে আশার উড়ে বাণী। আপনাকে তখন বিয়ে করতে হবে। আপনি দেশের বাইরে যাবেন হানিমুনের সংসারে আসবেন নতুন মুখ । বাড়বে খরচ একশো-বিশ সিসির বাইক তখন আপনার আর পোষাবে না। একটা ব্র্যান্ড নিউ রিকোন্ডেশন গাড়ির দিক ঝুঁকবেন আপনি । নিশ্চিত থাকুন. গাড়ি কেনা হলে flat বা বাড়ি কেনার কথা মাথায় করবে. বুড়ো বয়সে একটা ঠাঁই তো লাগবে. বাচ্চা কাচ্চার পড়াশোনার খরচ ঢাকা শহরে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, আত্মীয়-স্বজন, সামাজিকতা, চিকিৎসা সব করতে করতে একদিন দেখবেন টুক করে মারা গেছেন আপনি. আর মৃত্যুর আগে আবিষ্কার করবেন সারাটা জীবন টাকা কামাই করা আর খরচ করা ছাড়া অন্য কিছুই করেননি আপনি. এমন জীবন কি চেয়েছিল কেউ? দু হাজার সতেরো সালে একটা অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা যায় আমেরিকার শতকরা আটাত্তর পার্সেন্ট চাকরিজীবী কোনো মতে খেয়ে পরে বেঁচে আছে. আমেরিকানরা এটাকে বলে লিভিং ইন বিটুইন paycheck to paycheck.
অর্থাৎ তারা আয় করছে ঠিকই. কিন্তু কোন সঞ্চয় নেই তাদের. বছরে দশ হাজার ডলার আয় করা শ্রমজীবী মানুষটির যে অবস্থা. কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে সুট ট্রাই পড়ে গাড়ি হাকিয়ে যাওয়া উচ্চ মধ্যবিত্তেরও সেই একই দশা. তারা পরিশ্রম করছে. ওভার টাইমে কাজ করছে. কিন্তু যেই টাকা কামাচ্ছে তার বিপরীতে বাড়ছে খরচ. জীবনযাত্রার বিশাল ব্যয় তো আছেই. আয় বাড়ার সাথে সাথে লিভিং স্ট্যান্ডার্ড মেনটেন করার ঝামেলাও বাড়ছে. আর তাই তারা লোন নিচ্ছে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে. প্রতি মাসেই ব্যাংকের কাছে বাড়ছে দেনা । দিতে হচ্ছে চড়া সুদ। পুরো পৃথিবীর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের দেনার দিক থেকে আমেরিকার নাগরিকরা আছেন এক নম্বরে. বাংলাদেশেও বাড়ছে ক্রেডিট কার্ড হোল্ডার. তারাও ঝাঁপিয়ে পড়ছে দেনার দিকে. কিভাবে বেঁচে আছেন? এত দেনা ঘাড়েনি? কেন cost minimize করছেন না আপনারা? এবার ভাবুন আপনি দিনরাত এক করে খাটছেন কেন? একটু স্বচ্ছন্দময় জীবনের আশায়. তাই না? বেশি পরিশ্রম মানেই বেশি হয়. জীবনটা নির্ভর হবে একটু ফিনান্সিয়াল স্টেবিলিটি আসবে. ছোটখাটোর শখগুলো পূরণ হবে. কিছু সঞ্চয় জমবে এই জন্যই তো. কোথায় সেই সঞ্চয়? মানসিক সুখ আর শান্তিটাই বা কোথায়? একা আসবে আর চলে যাবে. এই জন্যই কি এত কষ্ট করে আমরা টাকা কামাই. এখন বুঝতে পারছেন কেন রেট রেস নামের বাহারি বিশেষনে বিশেষায়িত করা হয়েছে একে. অর্থ আয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্যটাই ভুলে গেছি আমরা.
সবাই শুধু ঘাড় গুঁজে পরিশ্রম করছি টাকা কামানোর জন্য সেই টাকা কিভাবে খরচ করতে হবে সেই জ্ঞান আমাদের কেউ দেয়নি. স্কুলে শেখানো হয়নি, কলেজে পড়ানো হয়নি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে গেলেও আমরা জানি না মানি ম্যানেজমেন্টের কৌশলগুলো. স্কুল কলেজে আমাদের দৌড়োতে শিখিয়েছে অদৃশ্য একটা রেসে নামিয়ে দিয়েছে. কিন্তু কোথায় কিভাবে থামতে হবে? সেই শিক্ষাটা কেউ দেয়নি. আর তাই আমরা সামিল হয়েছি রেট রেসের গোলোক ধাবায়. নিজেকে তিনটা প্রশ্ন করুন. তাহলেই আপনি বুঝে যাবেন এই ইঁদুর দৌড়ের মিছিলে আপনিও আছেন কিনা. এই যে আয় এবং খরচ এই চক্রটার শেষটা কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন? এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাটা কি আপনার ক্যারিয়ারের সঙ্গে মিশে গেছে? অন্যদের কি আছে কি নেই, কে কত টাকা বেতন পাচ্ছে, কত কি অর্জন করছে সেসব নিয়ে নিজের সাথে তুলনা করে অবসাদে ভোগাটাকে আপনার অস্থি মজ্জায় মিশে গেছে. যদি আপনি এই চক্রটা শিগগির শেষ হবার কোনো সম্ভাবনা দেখতে না পান. যদি আপনার ক্যারিয়ারে টাকা কামানোটাই মুখ্য বিষয় হয়ে থাকে. এতো কাজ করেও যদি আপনার মধ্যে কাজের প্রতি ভালোবাসার অন্তরে খুশি না থাকে. যদি অন্যের প্রাপ্তি আপনার বুকে খানিকটা হলেও হীনমন্যতা আর ঈর্ষার জন্ম দেয় তাহলে বন্ধু আপনি পড় গেছেন রেট রেসের অসুস্থ এই গোলক ধাঁধায় ।
এখান থেকে বেরোতে হবে আপনাকে নইলে সুখ নামের মরীচিকার দেখা পাবেন না কোনদিন এই জীবনে। এই রেট রেস বা ইঁদুর দৌড় থেকে কি তাহলে মুক্তির কোন উপায় নেই? অবশ্যই আছে. উপায়টা খুব সহজ. কিন্তু সমস্যাটা কোথায় জানেন? আমরা বুঝতেই পারি না এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নিজেদের অজান্তে কখন নেমে পড়েছি আমরা. বুঝতে পারলেও হয়তো পাত্তাই দিতে চাই না. কারণ সমাজ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে, জীবনে টাকা পয়সাটাই সব. হ্যাঁ. টাকা পয়সার গুরুত্ব আছে. কাগজের ওই নোটগুলো ছাড়া জীবন অচল. কিন্তু তাই বলে সেগুলোর পেছনে জীবন বরবাদ করে দেওয়ার তো কোনো মানে নেই. প্রথম কথা হচ্ছে সিস্টেমের বাইরে গিয়ে আপনি আপনার লাইফ স্টাইল বদলাতে পারবেন না। আপনাকে সিস্টেমের ভেতরেই থাকতে হবে এবং এর ত্রুটি বিচ্যুতি গুলো মেনে নিয়েই থাকতে হবে. বাজারে প্রতিটা জিনিসের দাম বাড়তি. চাল থেকে তেল, সাবান থেকে লবণ, প্রতিটা পণ্যের দাম বেড়ে গেছে. প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে. এর মধ্যেই আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে করতে হবে কোর্স কাটিং. অর্থাৎ কমাতে হবে জীবনধারণের খরচ. বিলাসিতা পরিহার করতে হবে নজর দিতে হবে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যগুলোর দিকে. কি কি না হলেই আপনার চলছে না. বাসায় টিভি দরকার. ফোরকি টিভি কিনে বাড়তি খরচ করার সামর্থ্য আপনার থাকতেই পারে. কিন্তু সেই বাড়তি খরচটা আবার আপনাকে দু মাস ভোগাবে কিনা সেটা আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।
আর একটা ব্যাপার যেটা রেট রেস কবল থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে সেটা হচ্ছে নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন. সেই নিয়মের ভেতরে সবকিছু থাকবে চলাফেরা থেকে কেনাকাটা সবকিছু. আপনি সুপার শপে গেছেন. ব্যাগ ভর্তি কেনাকাটা না করে দরকারি জিনিসগুলোই কিনুন। তার আগে সেগুলোর একটা লিস্ট বানান । এমন লিস্ট গোটা মাসের থাকুক সপ্তাহ বা দিন হিসেবে ভাগ করে নিন সব কিছু। বাসা ভাড়া বাবদ আপনার কত খরচ হচ্ছে খাবারের পেছনে কত যাচ্ছে? যাতায়াতে কত টাকা খসে যাচ্ছে? গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল, বাচ্চার স্কুল, জামাকাপড় বাবা মায়ের ওষুধ প্রতিটা খরচের হিসেব নির্দিষ্ট থাকুক. আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের থাকুক একটা সংযোগ. অল্প কিছু টাকা হলেও আলাদা করে রাখুন সঞ্চয় হিসেবে. কাল যদি আপনার চাকরি চলে যায়, কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটে. বিপদ আপদ আসতে পারে মাথার উপর. তখন তার রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ানোরও জায়গা পাবেন না. করোনা আসার আগে ঢাকা শহরে সরকারি এবং বেসরকারি চাকরিজীবীদের উপর একটা গবেষণা চালানো হয়েছিল. সেই রিপোর্টে উঠে এসেছিল শতকরা চুরাশি পার্সেন্ট চাকরিজীবী নিজেদের চাকরি নিয়ে ভীষণ অসুখী. কেউ অল্প বেতনের কারণে বিরক্ত, কেউ বোনাস না পেয়ে অসুখী আর কেউ বা বসের দুর্ব্যবহারে চাকরি ছাড়তে চায়. কিন্তু আর একটা চাকরি জোটাতে পারবেন কিনা সেই গ্যারান্টি নেই. তাই জোর করেই ঘর গুঁজে চাকরিটা করে চলেছেন তারা. এটা সত্যিই যে দেশে শ্রমের মজুরিটা খুব কম.
কিন্তু আমাদের লাইফ স্টাইল আর চিন্তা ভাবনাতেও যে বড় সর গলদ আছে সেটা আমরা ভাবতে চাই না. আবার কখনো কখনো স্বীকারও করি না. এই যেমন ধরুন না, উদ্যোক্তা হওয়া. এই ব্যাপারটা এখনো আমাদের দেশে ছোট করে দেখা হয়. অল্প বেতনের একটা চাকরিকে যত গুরুত্ব দেওয়া হয়. স্বাধীন ব্যবসা ঠিক ততটাই তিরস্কৃত. একটা স্বাধীন ব্যবসা পারে আয় ব্যয়ের এই মনোপুলিটা ভাঙতে. উদ্যোক্তা হলেও আপনাকে খাটতে হবে । পরিশ্রম করতে হবে. হাড়ভাঙা, টাকাপয়সা টানাটানির মধ্যেও কাটাতে হবে দিন. কিন্তু সেটা আপনি নিজের জন্য করবেন. অন্যের জন্য আপনাকে দিনরাত এক করে কলোর বলপের মতো শ্রম দিতে হবে না. এসব উদ্যোগ আপনাকে পরিচিতি এনে দেবে. আপনার জন্য বয়ে আনবে সম্মান. রেট রেস থেকে মুক্তির খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্ট হচ্ছে অন্যের সঙ্গে নিজেদের অবস্থার তুলনা না করা. অন্যরা কি করছে কি কিনছে কিভাবে থাকছে সেটার সঙ্গে আপনার জীবন ধারণের কোনো সম্পর্ক নেই. অফিসে যিনি আপনার সহকর্মী আপনার সমানই বেতন বোনাস পান. তিনি যদি একটা লেটেস্ট মডেলের আইফোন কিনে বসেন. খুব স্বাভাবিক আপনারও ইচ্ছে হতে পারে একটা আইফোনের মালিক হবার. লাখ খানেক টাকার একটা আইফোন কেনা আপনার সাধ্যের বাইরে হয়তো নয়. কিন্তু ওই যে বললাম এই আইফোন কেনাটা হয়তো আগামী কয়েক মাস আপনার কপালে দুশ্চিন্তার গভীর ভাঁজ ফেলে রাখবে. আপনি কি চান? আইফোনের ইউজার এক্সপিরিয়েন্স নাকি অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি. choice টা কিন্তু আপনার. জীবনের প্রতিটা ধাপে আমরা উন্নতি করি. নতুন social economic culture এ update হই. তার মানে এই নয় যে সক্রিয়তা বিসর্জন দিয়ে বারবার যে পাত্রে আছি সেই পাত্রেরই আকার ধারণ করতে হবে. অন্যের মতো হতে চাওয়টা অন্যের কাছে যা আছে সেটা নিজের করে পেতে চাওয়া টা অসুখী মানসিকতার একটা নিদর্শন । জীবনকে সহজ করে তুলুন ব্যাংকের ইএমআই ক্রেডিট কার্ডের ঋণ এসব থেকে মুক্ত থাকুন একটু বেখেয় হলেই জিন্দাবাদ এর ভূতের মতো এসব চেপে বসতে পারে আপনার ঘাড়ে ।
আর একবার বসলে তাকে ঘাড় থেকে নামানোটা রীতিমতো দুরূহ ব্যাপার. একটা আইফোন কেনা একটা গাড়ি কেনা বা একটু বিলাসে জীবন যাপন করাটা দোষের কিছু নয়. নয় কোনো অন্যায়. কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে আপনার প্রয়োজনটা. কাজের ফাঁকে নিজের জন্য সময় বের করুন । সময় দিন পরিবার আর প্রিয় মানুষগুলোকে নজর রাখুন নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও মানুষ হয়ে জন্মেছেন ইঁদুরের মতো উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে দৌড়ে কেন সেই জীবনের অপচয় করবেন বলুন ? আয় খরচ আর ব্যয় রেট রেস এর এই দুষ্টু চক্রের বাইরে বেরিয়ে জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে উপভোগ করুন। বাচুন. নিঃশাস নিন . জীবন সুন্দর । আসলেই সুন্দর যদি আপনি সুন্দর করে সাজানোর চেষ্টা করে সফল হন তবেই।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন