পর্দার আড়ালে একা খেলে যাচ্ছেন একজন. কামাচ্ছেন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার. অথচ তাকে চেনে খুব কম সংখ্যক মানুষ. আইটি জগতে ইলন মাস্ক, জেফ বোজোস বা বিট গ্রেটসের সাথে তার নামও সমান তালে চলার কথা ছিল. কিন্তু বিহাইন্ড দা সিনে একা গোল করে যাচ্ছেন তিনি. নাম ড্রোন ইয়াং পিং ড্রোন ইয়াং পিং নামটি মোবাইল ফোনের জগতে খুবই কম মানুষের শোনা. তবে তার নাম অজানা থাকলেও তার কোম্পানি বিবিকে ফোন গিগদের মধ্যে বেশ পরিচিত. ওয়ান প্লাস, রিয়েলমি, অপো, ভিভো এবং আইকিউ. এই পাঁচটি জনপ্রিয় মোবাইল ব্র্যান্ডের একক মালিক ডোন ইয়াং পিন.
এই ব্র্যান্ড গুলো তার কোম্পানিতে পরিণত করেছে বর্তমানের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী কোম্পানিতে. অ্যাপেল , শাওমি বা স্যামসাং যারা মোবাইল ফোনের জগতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড তাদেরকেও পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে বিবিকে কোম্পানি। কিন্তু এত সফলতার সত্ত্বেও বেশিরভাগ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী এমনকি ফোন গিগরাও তার সম্পর্কে বলতে গেলে তেমন কিছুই জানে না. এলেন মাস্ক, স্টিভ জবস বা জ্যাকমা, যারা কিনা টেকনোলজির জগতে খুবই পরিচিত তাদের সম্পর্কে অনলাইনে অগণিত তথ্য রয়েছে। কিন্তু ডন ইয়ং পিং এর ক্ষেত্রে বিষয়টা একেবারে ভিন্ন. তিনি অ্যাপেলের সবচেয়ে বড় শেয়ার হোল্ডারদেরও একজন. যা কিছু তথ্য তার সম্পর্কে এখনো পর্যন্ত জানা গেছে তার বেশিরভাগই এসেছে তার দেওয়া গুটিকয়েক সাক্ষাৎকার থেকে এবং এগুলোর বেশিরভাগই চাইনিজ ভাষায় দেওয়া সাক্ষাৎকার. আবার এসব সাক্ষাৎকারের বেশিরভাগই প্রায় এক যুগ পুরোনো এবং তার নিজস্ব ব্লগেও তার নিজস্ব সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্যই নেই. এসব কারণে টেকনোলজির জগতে তিনি বলতে গেলে রহস্যে ঘেরা একজন মানুষ.
মিস্টার ডোয়ান উনিশশো আশির দশকে জুসাইন ইউনিভার্সিটি থেকে রেডিও প্রযুক্তিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন. তারপর তিনি বেইজিং এর রেনমিন ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিক্স নিয়ে পড়াশোনা করেন. ইউনিভার্সিটি থেকে বের হওয়ার পর পরই তিনি দক্ষিণ চীনের জংশন নামক শহরে একটি ছোট্ট ইলেকট্রনিক কোম্পানিতে চাকরি নেন. যে কোম্পানি তখন প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার অবস্থায় ছিল. চাকরিতে প্রবেশের সাথে সাথেই তিনি বলতে গেলে একটা অলৈকিক অর্থনৈতিক ঘটনা ঘটান. ইলেকট্রনিক জগতে কাজ করা অন্য অনেকের মতোই তিনি তার ক্যারিয়ার শুরু করেন সানজাই হিসেবে. এই কাজটি হচ্ছে মূলত অন্য ইলেকট্রিক যন্ত্রের কপি এবং রিপ্লিকা তৈরি করা. সেই সময় নিনটেন্ডো গেমিং টেকনোলজির জগতে ঝড় তুলেছে। কিন্তু চীনের কোথাও তখন নীল্টেন্ডও কিনতে পাওয়া যেত না। মিস্টার ঢোয়ান তখন চিপ তৈরিকারী কোম্পানি মিডিয়াটেকের সাথে যুক্ত হয়ে চীনের বাজারের জন্য নীল্টেন্ডও এর ক্লোন বা কপি তৈরি করেন।
মিডিয়টেক যা তখন সানজাই কিং নামে পরিচিত ছিল তারা নিনটেন্ডোর চিপটি নিয়ে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে নিজস্ব চিপ তৈরি করে এবং মিস্টার দুয়ানের সাথে মিলিত হয়ে গড়ে তোলে শাওবা ওয়াং গেমিং কনসোল. এই গেমিং কনসোল সারাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বলতে গেলে রাতারাতি সাফল্য লাভ করে. মিস্টার ড্রোয়ান মূলত এই গেমিং কনসালটিকে নিজস্বতা প্রদান করার মাধ্যমে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন. গেমিং কনসাল্টটি তৈরির পরপরই তিনি এতে যুক্ত করেন একটি কিবোর্ড এবং একটি সফটওয়্যার ডিকশেনারি. সাথে বুদ্ধি প্রয়োগ করে এই পুরো যন্ত্রটিকে তিনি বলেন একটি লার্নিং মেশিন. এতে করে বাচ্চাদের সাথে সাথে অভিভাবকদের মধ্যেও কনসোলটি জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বাচ্চারাও তাদের অভিভাবকদের এটা বোঝানোর সুযোগ পায় যে পড়াশোনা এবং স্কুলের প্রয়োজনে এই মেশিনটি তাদের দরকার। তারা এই লার্নিং মেশিনের প্রচার ঘটানোর জন্য তখনকার চিনে বিখ্যাত এক বিজ্ঞাপন তৈরি করে। যেখানে অভিনয় করেন জনপ্রিয় অভিনেতা জ্যাকি চ্যাং এবং বিজ্ঞাপনটি পুরো দেশে সাড়া ফেলে দেয়. এই বিজ্ঞাপনে একটি স্লোগান ব্যবহার করা হয় যা বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়. আপনার সন্তানকে ড্রাগন হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য অনুপ্রাণিত করছি. চিনে ড্রাগন হিসেবে বেড়ে ওঠার অর্থ হচ্ছে পড়াশোনার মাধ্যমে সফলতা অর্জন যে কারণে বিজ্ঞাপনটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিশাল সফলতা অর্জন করে. সফলতার জন্য তিনি দশটি ধাপ বিশিষ্ট একটি প্রক্রিয়ার বিকাশ ঘটান. প্রথমত আপনাকে একটি ভালো পণ্য তৈরি করতে হবে। পণ্যটি একেবারে স্বতন্ত্র হতে হবে এমন কোন কথা নেই.
তবে তা ভালো মানের হতে হবে এবং এমন কিছু হতে হবে যার চাহিদা থাকবে বেশিরভাগ মানুষের কাছে বা অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ তা কিনতে চাইবে. এরপর দ্বিতীয় ধাপ থেকে নবম ধাপ পর্যন্ত শুধুই মার্কেটিং, মার্কেটিং এবং মার্কেটিং. কারণ যে বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি সে বাজারে পণ্যের দিকে ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মার্কেটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ. তারপর দশম ধাপটি হচ্ছে কর্মচারীদের প্রতি সততা এবং তাদের প্রতি উদার মনোভাব প্রদর্শন. এক সময় মিস্টার দুয়ান চাকরি ছেড়ে দেন এবং তিনি নিজের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম দেন বিবিকে. আগের কোম্পানিটি থেকে তিনি তার সাথে মাত্র ছয় জন কর্মচারী নিয়ে আসেন. কিন্তু অত্যন্ত সকলের সাথে অতন্ত্য সুব্যবহারের ফলাফল হিসেবে সকল ডিস্ট্রিবিউটার এবং সাপ্লাইআরা তাকে অনুসরণ করে এবং দ্রুত তার ব্যবসা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করে. প্রথম পণ্য হিসেবে তারা ভিসিডি প্লেয়ার উৎপাদন শুরু করে এবং পরবর্তী ধাপ হিসাবে শুরু করে এর মার্কেটিং. বিজ্ঞাপনের জন্য বিবিকে কোম্পানি একবার জেটলির সাথে চুক্তি করে. যে কিনা তখন চীনের একেবারে প্রথম সারির অভিনেতা ছিলেন. এমনকি মিস্টার ডোয়ান ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকাকালীন সময় আর্নার সোঅ্যারস সাথেও বিজ্ঞাপনের জন্য চুক্তি করেন. যদিও বিভিন্ন কারণবশত সেই বিজ্ঞাপন প্রচার করা সম্ভব হয়নি. বিবিকের একদম অত্যাধিক মার্কেটিংয়ের জন্য পরবর্তীতে অনেকে একে ব্রেন ওয়াশিং ফ্যাক্টরিও বলেছেন. মিস্টার দোয়ান এবং তার কোম্পানি বিবিকে ব্যাপক সফলতা অর্জন দিয়ে চীনের বিসিডি এবং ডিভিডি মার্কেটে কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সমর্থ হয়. এরপর তারা আবারও learning machine এবং সেই সাথে মোবাইল ফোন উৎপাদন শুরু করে। এ সময় মিশ্র দোয়ান সিদ্ধান্ত নেন যে এই পণ্যগুলোর জন্য আলাদা আলাদা ব্র্যান্ড তৈরি করাটা লাভজনক হবে.
লার্নিং মেশিন বিবিকে ব্র্যান্ডের আওতাভুক্ত থাকে. অপো হয়ে ওঠে অডিও ভিজুয়াল প্রোডাক্ট. যেমন ভিসিডি ডিভিডির জন্য একটি নতুন ব্র্যান্ড. এবং ভিভো ব্র্যান্ডটি তৈরি হয় কোম্পানির মোবাইল ফোন ব্যবসার জন্য. তিনটি ব্র্যান্ডের জন্য তিনটি আলাদা সিইও নির্বাচিত করা হয় এবং এই তিনজনকেই কোম্পানির শুরুর ছয় জন মূল কর্মচারীর মধ্য থেকে বাছাই করা হয়. মিস্টার দোয়ানে তিনটি ব্র্যান্ডের দায়িত্ব ও তার বিশ্বাসী তিনজন সহযোগীর উপর দিয়ে মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসা থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি ক্যালিফোর্নিইয়াতে চলে যান জীবনের বাকিটা সময় নিভৃতে পার করার জন্য. শুরুতে মিস্টার দোয়ানের প্রতিষ্ঠিত এই তিনটি ব্র্যান্ডের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য ছিল যেহেতু তারা ভিন্ন ভিন্ন পণ্য উৎপাদন করতো.
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই পার্থক্য কমে আসে. প্রথমে লার্নিং মেশিনের চাহিদা কমে যাওয়ার সাথে সাথে বিবিকে ব্র্যান্ড ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়. এরপর ভিসিডি এবং ডিভিডিরও চাহিদা কমে আসায় অপো কোম্পানিটি আরেকটি ভাগ খুলে যায়. সেই সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এমপি থ্রি প্লেয়ার তৈরি করা শুরু করে. কিন্তু এরপর অডিও প্লেয়ারও যখন মোবাইল ফোন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় তখন অপো মোবাইল ফোন উৎপাদন শুরু করে. যার ফলে বিবিকে কোম্পানিরই দুটি মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী ব্র্যান্ড অর্থাৎ অপো এবং ভিভো একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়. বিবিকের মতো এই দুটি ব্র্যান্ড ও মার্কেটিং এর বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করে এবং বিজ্ঞাপনের জন্য সেলিব্রিটিদের স্পনসর করে. উদাহরণস্বরূপ চীনে অপো স্মার্টফোনের সর্ব প্রথম বিজ্ঞাপনটিতেই প্রোমোটার হিসেবে দেখা যায় বিশ্বখ্যাত অভিনেতা লিওনাডু ডি ক্যাপিও কে. এখনো প্রতিটি অপূর্বা ভিভো মোবাইল ফোন লঞ্চ অনুষ্ঠানে দেখা যায় কোনো ভারতীয় ক্রিকেট খেলোয়াড় বা কোনো পপস্টার উপস্থিত থাকেন। পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তারা নিশ্চয়ই ডুয়ানের মতাদর্শ অনুসরণ করে।
শাওমি এবং স্যামসাং এর মতো অনেক ধরনের পণ্য উৎপাদনের পরিবর্তে অপো এবং ভিভো মূলত মোবাইল ফোন এবং গুটিকয়েক পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দেয় এবং বেশি ভাগ সময় তাদের প্রতিযোগীদের মতো ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন নিত্য নতুন ধরনের মডেল তৈরি করে না। টেকনোলজি প্রেমীদের জন্য এধরণের পদ্ধতি কিছুটা হতাশা ব্যঞ্জক হলেও একে প্রযুক্তি বিমুখতা ভাবার কোনো কারণ নেই। এটাই তাদের ব্যবসায় কৌশল যা মূলত মিস্টার দোয়ানের একটি উক্তিরই আত্মপ্রকাশ। সর্বশেষে আসার সাহস করো এবং সেখান থেকে কর্তৃত্ব নাও । আপাত দৃষ্টিতে এই ধরনের কৌশল বোরিং বা একঘেয়ে মনে হলেও এর ফলে মিস্টার দোয়ানের কোম্পানি কখনোই এমন পণ্য বাজারে ছাড়ে না যা অপমান জনক ব্যর্থতার সম্মুখীন হবে। তিনি এরই মাঝে শুরু করেন ওয়ান প্লাস মোবাইলের বাজার। রিয়েলমিও অফ কোর সিস্টার কনসাল্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ওয়ান প্লাস বাজারে এসেই মোবাইল গিগদের তাক লাগিয়ে দেয়। এখনো পর্যন্ত অ্যান্ড্রয়েড জগতের অন্যতম সেরা প্রিমিয়াম কোয়ালিটির মোবাইল উৎপাদন করে যাচ্ছে এরা। অপো ভিভো রিয়েলমি বা ওয়ান প্লাস মার্কেটিং এ কেউই কিন্তু পিছিয়ে নেই. অনেকটা নিজ ভাইবোনের মাঝে কে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে সেই দৌড়ে আছে তারা. মিস্টার ডুয়ান রয়ে যান পর্দার পেছনেই তাকে নিয়ে লেখা বা ভিডিও পাওয়াও যথেষ্ট দুষ্কর কাজ. দর্শক আজ এই পর্যন্তই. কেমন লাগলো তা কমেন্ট বক্সে জানাতে ভুলবেন না.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন