সালটা উনিশশো আটানব্বই. বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার সদস্য পদের জন্য আবেদন করে চীন। তাদের জন্য বিষয়টা ঠিক এতটা সহজ ছিল না। কারণ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ তখন চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়. এর অবশ্য কারণও ছিল. চীনা কোম্পানিগুলো বিখ্যাত ব্র্যান্ডের রিপ্লিকা ছাড়া আর কিছুই নয় বা নকলপূর্ণ বানায় এই বদনামে ছেয়ে গেছে তখন চারিদিক. চীন সরকার এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নেয় না.
সেই সময় চীনের পক্ষে দাঁড়িয়ে সেই দেশগুলোর রাগ ভাঙিয়েছিলেন তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিটন কিন্তু ক্লিটন যদি জানতেন বছর বিশেকের মধ্যেই বৈশিক অর্থনীতিতে তার দেশকে পেছনে ফেলে সুপার জায়ান্ট হবার দূরে এগিয়ে যাবে চীন। এই কাজটা হয়তো তিনি করতেন না কখনো. সেই সময় আমেরিকার অর্থনীতি ছিল নয় ট্রিলিয়ন ডলারের. আর চীনের অর্থনীতির মূল্যবান ছিল মাত্র এক ট্রিলিয়ন ডলার. নয় গুণ পিছিয়ে থাকা একটা দেশের সঙ্গে কোন প্রতিযোগিতাই নেই. এমনটাই হয়তো ভেবেছিলেন ক্লিটন। কিন্তু সেটা যে কত বড় ভুল ধারণা ছিল. সেটা এখন আমেরিকানরা জানে হাড়ে হাড়ে. ছোট্ট একটা ডেটা দিয়ে শুরু করা যাক. দু হাজার বিশ সালে পুরো পৃথিবীতে মোট তিন দশমিক দুই চার মিলিয়ন ইউনিট ইলেক্ট্রনিক ভেহিকেল বা বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি বিক্রি হয়েছে. এরমধ্যে ইউরোপের সবগুলো দেশ মিলিয়ে বিক্রি করেছে প্রায় চোদ্দ লক্ষ ইউনিট গাড়ি। অন্যদিকে শুধু চিনেই বিক্রি হয়েছে সাড়ে তেরো লক্ষ ইউনিট গাড়ি আর আমেরিকা সে দেশে বিক্রি হয়েছে মাত্র তিন লক্ষ আঠাশ হাজার ইউনিট ইলেকট্রিক ভেইকেলস। সংখ্যাটার পার্থক্যের দিকে একটু মন দিলে আপনার চোখের সামনে চমৎকার একটা গল্প ভেসে উঠবে।
জনসংখ্যার আধিক্যকে অভিশাপের পরিবর্তে আশীর্বাদ বানিয়ে দ্রুত গতিতে চীনের এগিয়ে যাওয়ার এক অন্যরকম গল্প । না চীন এই জায়গায় একদিনে পৌঁছোয়নি বছরের পর বছর ধরে তারা কাজ করেছে ইলেকট্রিক ভেহিকেল নিয়ে । বিশেষ সবচেয়ে বেশি কার্বন দূষণ হয় চীনে দু হাজার ষাট সালের মধ্যে নিজেদের দেশকে কার্বন নিউট্রল কান্ট্রিতে পরিণত করার অভিপ্রায় দেশটিতে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ চালিত গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে. সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে ইলেকট্রিক ভেহিকেল ইন্ডাস্ট্রিতে. এই খাতে প্রচুর ভর্তুকিও দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে প্রণোদনা। চীন জানতো ইলেকট্রিক ভেহিকেলই যানবাহনের ভবিষ্যৎ । আর তাই এই ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করার জন্য অনেক আগে থেকেই সুক্ষ পরিকল্পনা নিয়ে তারা এই মাঠে নেমেছে এবং সেই অনুযায়ী কাজও করছে । ফলাফল সেটা তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছেন। ইউরোপের সব দেশগুলো মিলিয়েও চীনের সাথে টেক্কা দিতে তাদের রীতিমতো খবর হয়ে যাচ্ছে.
আর আমেরিকা সে তো আছে পিছিয়ে. যোজন যোজন দূর. টেসলা ক্যারের জয়জয়কারের মাঝেও ইলেকট্রিক ভেহিকেল মার্কেটের সংখ্যার বিচারে চীনের কাছে আমেরিকা এখনো নিতান্তই শিশু. চাইলেই এই সেক্টরটাকে শুধুমাত্র রূপক হিসেবেই ধরতে পারেন. এটা একটা ছোট্ট কেস স্টাডি হয়ে থাকবে আধুনিক বিশ্বের বুকে চিনা আধিপত্যের। যুদ্ধে জর্জরিত মোটামুটি তুলনামূলক দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে ভরপুর একটা দেশ কিভাবে নিজের বিশাল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে বিশ্ব নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে. চীন তার আশ্চর্য এক নমুনা. অর্থনীতি প্রযুক্তির খেলাধুলা, সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক আগ্রাসন কোথায় নেই চীনের শ্রেষ্ঠত্ব। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, যোগ্য নেতৃত্ব, ঝুঁকি নেওয়ার দুঃসাহস আর দক্ষ জনবলের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য যে নিজের হাতেই লেখা যায় তারও একটা চমৎকার বিজ্ঞাপন হয়ে থাকবে চীনের এই উত্থান. একটু ইতিহাস কসলালাম । বিরক্ত হবেন না. নইলে গল্পটা ঠিকঠাক বোধগম্য হবে না আপনাদের. চীনের উন্নতির যাত্রা দুভাবে শুরু হয়েছিল. প্রথমটি ঊনিশশো ঊনপঞ্চাশ সালে চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের সময় এবং দ্বিতীয়টি উনিশশো ছিয়াত্তর সালে মাউজেতুং এর মৃত্যুর পর শুরু হয়. এবং সেটা এখনো চলছে বিপুল বিক্রমে। মাও সেতুং পুরো পৃথিবী থেকে চীনকে আলাদা করে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ভেতরেই চীনকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ অর্থনীতি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।
মাউ সেতুং চেয়েছিলেন চীন তার সকল প্রয়োজনীয় জিনিস নিজে উৎপাদন করবে । কমিউনিজমে ব্যক্তিগত ব্যবসার ধারণার কোন অস্তিত্বই ছিল না. সব ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল সরকারের অধীন. তাই তাঁর আমলে সরকারের মালিকানাধীন অনেকগুলো শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন. তবে চীনের অর্থনীতির স্ফুরনটা বড় আকারে শুরু হয়েছে মূলত মায়র মৃত্যুর পর। কমিউনিজম ছেড়ে আশিয়া নব্বই দশকের চীন পুঁজিবাদের পথেই হাঁটল । কারণ চীনের জনগণ এবং কমিউনিস্ট পার্টির অনেক শীর্ষ নেতাও বুঝতে পেরেছিলেন যে অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া উপায় নেই। ডেন দিয়া পিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় আমেরিকা সফর করলেন বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে এলেন. চীনে চারটি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হলো. এসব অর্থনৈতিক জোনের মধ্যে হাজার হাজার কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল. যে কারখানাগুলোর পশ্চিমা দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানির অনুমতি ছিল. চীনের অর্থনৈতিক জোনের এইসব কারখানা ছিল ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং tax ও ছিল অনেক কম. চীন যখন এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড়লো তখন এসব পণ্য হু হু করে বিক্রি হয়ে গেলো. কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং শ্রমের মূল্য কম হওয়ার কারণে চীনা পণ্যের দাম অন্যান্য দেশের পণ্যের চেয়ে ছিল অস্বাভাবিক রকমের কম.
এভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্যের চাহিদা তৈরি হল এবং চীন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে লাগলো. এ তো কেবল শুরু. এর পরের গল্পটা এগিয়ে যাওয়ার. সেই গল্পটাই বলবো আমরা কিন্তু তার আগে একটা পরিসংখ্যান দিয়ে আপনাদের । উনিশশো আটাত্তর সালে চীনের জিডিপি ছিল দুশো বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের. গোটা পৃথিবীর মোট জিটিবির চার শতাংশের সমান ছিল চীনের জিডিপি. আজ সেটা এগারো ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে. বিশ্বের মোট জিডিপির এগারো শতাংশেরও বেশি আসে চীন থেকে. চীন তাদের অর্থনীতিকে এতটাই শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে যে করোনার থাবায় গোটা বিশ্বের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়লেও করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের অর্থনীতিতে বড় কোন ধাক্কা লাগেইনি। চীন যা দেখিয়েছে তা গোটা বিশ্বের বাঘা বাঘা অর্থনীতির জন্যই ছিল এক আকর্ষণীয় অর্জন. দু হাজার বিশ সালে যেখানে আমেরিকার পার ক্যাপিটা জিডিপি টু পয়েন্ট থ্রি পার্সেন্ট কমেছে. সেখানে করোনা কালে চীনের জিডিপির প্রভৃতিই হয়েছে টু পয়েন্ট থ্রি পার্সেন্ট. গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বলা হচ্ছিল. জিডিপির অঙ্কে দু হাজার ছাব্বিশ সালে আমেরিকাকে পেছনে ফেলবে চীন. কিন্তু মহামারীর আশীর্বাদে সেই অর্জন হয়তো আরো বছর দুয়েক আগেই ঘটিয়ে ফেলবে দেশটি. কাউন্টার ফিট প্রোডাক্টস. এই শব্দ দুটো আগে কখনো শুনেছেন. একদম শুরুতে রিপ্লিকা আবার নকল পণ্যের কথা বলেছিলাম মনে আছে? কাউন্টার ফিট প্রোডাক্টস মানে হচ্ছে নকলপূর্ণ. একটু ভদ্রভাবে বললে রিপ্লিকা প্রডাক্ট. চীনের অর্থনীতি আজকে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে এই নকল বা রিপ্লিকা পণ্যের একটা বিশাল অবদান আছে. বিখ্যাত সব ব্র্যান্ডের রিপ্লিকা পণ্য বানানোর বেলায় চীন একদম ওস্তাদ. অন্যান্য কোম্পানির প্রোডাক্ট কপি করার কাজটি চীনের লোকজন করে থাকেন অসাধারণ দক্ষতায়. একটা পণ্যের উদ্ভাবনের পেছনে মাথা ঘামানো লাগছে না. ডিজাইন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না. সেই সাথে রিসার্চ এবং ডেভেলপমেন্টের পেছনেও সময় এবং খরচ দুটোই বেঁচে যাচ্ছে । সব দিক থেকেই লাভ চীনের ছোট বড় কোম্পানিগুলো এই কাজটা করে মূলত স্বল্প উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বাজারের কথা চিন্তা করে। রেপলিকা পণ্যের বিশাল এক মার্কেট |
রিপ্লিকা পণ্যের বিশাল এক মার্কেট আছে দুনিয়া জুড়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারতের মতো মধ্য এবং নিম্ন মধ্যয়ার দেশগুলোতে । এইসব জায়গায় এক চেটিয়া ব্যবসা করে china। জুতা থেকে মোবাইল ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে ল্যাপটপ কম্পিউটার সবকিছুরই চাইনিজ ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যাবে এই দেশগুলোতে । বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এই ইন্ডাস্ট্রির একছত্র আধিপত্য শুধুই চীনের হাতে। এখানে নেই তার কোনো প্রতিযোগী। আন্তর্জাতিক বাজারে নব্বই শতাংশ নকল বা রিপ্লিকা প্রোডাক্ট তৈরি হয় চীনে. বিশাল একটা ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে গেছে এই রিপ্লিকা পূর্ণ বানানোর ওপরে. দুহাজার আট সালে ফেরেরো নামে ইটালিয়ান এক চকলেট কোম্পানি একটা চিড়া কোম্পানির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছে. কারণ চীনা কোম্পানিটি ফেরারো ডিজাইন এবং ফ্লেভার হুবহু নকল করে চকলেট বানিয়ে বিক্রি করছিল. সেই মামলায় ফেরার ও জিতেছিল বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণও আদায় করতে পেরেছিল তারা. কিন্তু সব মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির তো আর এত ধৈর্য থাকে না যে ব্যবসা বাদ দিয়ে আদালতে দৌড়াবে? তাই চীনের রিপ্লিকা প্রোডাক্টের ইন্ডাস্ট্রিটা দিনকে দিন আকারে বেড়েই চলেছে. আর ফুলে ফেঁপে উঠেছে দেশটির অর্থনীতি. চীনের অর্থনীতিকে বড়সড় একটা বুস্ট এনে দিয়েছে স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রিতে চিনা কোম্পানিগুলোর উত্থান. নকিয়া অ্যাপেল বা স্যামসাং এর হাতে থাকা মার্কেটের আধিপত্যে ভাগ বসিয়েছে. শাওমি, ওয়ান প্লাস , ভিভো, অপো বা রিয়েলমির মতো কোম্পানিগুলো. প্রায় সেম কনফিগারেশনের ফোন অর্ধেক দামে ভোক্তার হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে এই বাজার দখল করেছে তারা. শুধু তাই নয়, ম্যানুফ্যাকচারের খরচ কমাতে স্যামসাং এবং অ্যাপোলো চীনে কারখানা চিনের তৈরী পূর্ণ ব্যবহার করছে নিজেদের প্রোডাক্টে. দক্ষ জনবল এবং শ্রমের মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রোডাকশনের খরচও কমেছে ব্র্যান্ডগুলো.
আর বাড়তি লাভের আশায় তারা আমেরিকা বা কোরিয়ার বদলে চীনে বিনিয়োগ করেছে. সেটাও চীনের অর্থনীতির পালে দিয়েছে এক জোরালো হাওয়া. একটা কথা খুব প্রচলিত. চীন চাইলে আপনারও একটা কপি তৈরি করে দিতে পারবে. মূলত কথার কথা হলেও বাস্তব অবস্থা কিন্তু এর অনেকটা কাছাকাছি. ঊনিশশো নব্বই সালে পুরো পৃথিবীর কারখানা যত পণ্য বা ম্যানুফ্যাকচারিং প্রোডাক্ট নির্মাণে চীনের অবদান ছিল মাত্র তিন শতাংশ. দু হাজার বিশ সালে সে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে সাতাশ শতাংশ. অর্থাৎ পুরো পৃথিবী জুড়ে যত ম্যানুফ্যাকচারিং প্রোডাক্ট উৎপাদন হয় তার চার ভাগের এক ভাগ চীন একাই উৎপাদন করে. এসব পণ্যের মধ্যে কাপড়, মোবাইল, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক পণ্য, গৃহস্থালির জিনিসপত্র থেকে গাড়ি, বিমান এমনকি স্পেসশিপও আছে । পুরো পৃথিবীর মোট উৎপাদিত এয়ার কন্ডিশনের শতকরা আশি শতাংশ শুধুমাত্র চীনে উৎপাদিত হয় । এছাড়াও পৃথিবী জুড়ে মোট উৎপাদিত মোবাইল ফোনের সত্তর পার্সেন্ট জুতার ষাট পার্সেন্ট সোলার সেল বা সৌর বিদ্যুতের সেলের চুয়াত্তর পার্সেন্ট সিমেন্টের ষাট পার্সেন্ট জাহাজ নির্মাণের পঁয়তাল্লিশ পার্সেন্ট এবং স্টিলের পঞ্চাশ পার্সেন্ট চীন একাই উৎপাদন করে. ভেবে দেখুন সংখ্যাটা কি বিশাল রকমের বড়. অর্থনীতি বেগবান হওয়ার সাথে সাথে অন্যান্য সেক্টরেও চীন তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের মিশনে নেমেছে.
চাইলে অলিম্পিককেই উদাহরণ হিসেবে ধরতে পারেন. ডাটা ঘেঁটে দেখুন আশি বা নব্বইয়ের দশকে অলিম্পিকে চীনের অবস্থান ছিল কোথায়? বেশিরভাগ সময় সেরা তিনের অনেক বাইরে. আর এখন চীন প্রতিটা অলিম্পিকের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য লড়াই করে. চীনের অ্যাথলিকরা স্বর্ণপদকটাই জিততে চান. রুপা কিংবা ব্রনজয়টাকে তারা ভাবেন ব্যর্থতা. আমেরিকার একক শ্রেষ্ঠত্বকে এখানেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে চীন. দু হাজার আট সালে নিজেদের দেশে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে তাঁরা সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ জিতেছে ছিল. কিছুদিন আগে শেষ হওয়া টোকি অলিম্পিকেও একটুর জন্য সফলতম দেশ হতে পারেনি তারা. আমেরিকার চেয়ে তাদের স্বর্ণপদকের সংখ্যা কম ছিল কয়েকটি জানেন মাত্র একটি. চীন ভালো করেই জানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই হচ্ছে ভবিষ্যৎ. আর তাই এই বাজারটা দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বেইজিং. দেশটির প্রায় বিশটি প্রদেশের উৎপাদনশীল কারখানাগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয়েছে. প্রকাশ করা হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আলাদা নীতিমালাও. দু হাজার ষোলো সালে এআইএর ওপর ভিত্তি করে পনেরোশো নতুন কারখানার যাত্রা শুরু হয়েছে. প্রায় একশো বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়েছে এই শিল্পে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট, ড্রোন বা যাত্রীবাহী কার রপ্তানিতে এখন এক নম্বরে আছে চীন. মহাকাশ গবেষণাতেও পিছিয়ে নেই তারা. চাঁদের যে অংশটি পৃথিবী থেকে কখনোই দেখা যায় না সেই দূরবর্তী দিকে এই প্রথম একটি রোবট চালিত মহাকাশযান নামিয়েছে চীন । মঙ্গল গ্রহে সফলভাবে মহাকাশযান অবতরণ করাতে পেরেছে তারা. এতদিন পর্যন্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে মহাকাশযান অবতরণ করাতে পেরেছিল. চীন পৃথিবীর দ্বিতীয় দেশ হিসাবে মঙ্গলে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে.
মহাকাশে এখন একমাত্র একটি স্পেস স্টেশন আছে. আমেরিকার বানানো সেই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনটি যেটা চীনকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না. চীন তাই মহাকাশে স্থায়ী স্টেশন বানানোর কাজ নিজেরাই শুরু করে দিয়েছে. পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্পটিও বানিয়েছে চীন. নিজেদের দেশে. শুধু শিল্প নয়. কৃষিতেও চীনের মুখাপেক্ষী গোটা বিশ্ব । দুহাজার সালের পর থেকে মানুষের প্রয়োজনীয় সবুজপণ্য সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করেছে চীন. বর্তমান বিশ্বের বাইশ শতাংশ মানুষের উদর পূর্তির কাজ করছে চীনের কৃষি উৎপাদন. সময়ের সাথে সাথে চীন তাদের সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি করেছে বহুগুণে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে আছে. গত বছর লাদাখে ভারতীয় সেনাদের সাথে চীনের সেনাদের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাটি. ভারতের প্রায় তেইশ জন সেনাকে হত্যা করে ভারতীয় লাইন of control এর ভেতরে ঢুকে বেশ কয়েক কিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছিল চীনের সেনাবাহিনী. সামরিক বা কূটনৈতিক প্রতিবাদ তো দূরে থাকুক বেইজিং এর বিরুদ্ধে অফিশিয়ালি একটা টু শব্দও করেনি দিল্লি. অত্যাধুনিক সমরাষ্ট্রে সজ্জিত চীনের সেনাবাহিনী যে কোন দেশের জন্যই বিরাট একটা হুমকির নাম। বিশেষ করে শি জিনপিং চীনের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার পর অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দিকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন. স্থল, জল কিংবা আকাশ যেকোনো জায়গায় চীনের বিরুদ্ধে লাগতে যাওয়া এখন একটা বিরাট বোকামিরই নামান্তর. চীনের এই অভাবনীয় অগ্রগতির পেছনে আছে সে দেশের স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা ।
চীনের সরকারের নীতিমালা প্রচণ্ড ব্যবসা বান্ধব নতুন উদ্যোক্তাদের এখনো সেখানে নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয় ভ্যাট ট্যাক্স এবং বিভিন্ন চার্জও মুকুব করা হয়. ইনফ্রাস্ট্রাকচারের দিক থেকে চীন বিশ্বের বুকে অনুকরণীয় এক আদর্শ. চীনের শ্রমিকরা অন্যান্য যে কোনো দেশের শ্রমিকদের চেয়ে বেশি প্রডাক্টিভ. কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে তাদের কাজ করার দক্ষতা এবং ম্যানেজমেন্ট স্কিল দুটোই ধারণ করা হয়. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা চীন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে. বিশ্ব ব্যাঙ্কের হিসাব অনুযায়ী চীন উনিশশো আটাত্তর সাল থেকে মার্কেট বেস্ট ইকোনমি হিসেবে যাত্রী শুরু করার পর থেকে তাদের আশি কোটির বেশি জনগণকে দারিদ্র্য সীমা থেকে মুক্ত করতে পেরেছে. অন্যান্য দেশ পরিকল্পনার সাজায় পাঁচ থেকে দশ বছরের হিসেব মাথায় রেখে. চীন পরিকল্পনার সাজে পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের হিসাব কষে. এ কারণে চীনের গ্রোথ রেশিও অন্যান্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক ভালো. শ্রীলঙ্কার হাম্বানডোটা বন্দরের গল্পটা কি আপনারা জানেন? শুরু থেকেই বলি চীনের একটা কোম্পানি শ্রীলংকা সরকারের সাথে হাম্বান টোটায় বন্দর বানানোর চুক্তি করে। লংকার সরকারকে কোনো টাকাই নগদে দিতে হবে না ঋণ হিসেবে তারা বছর বছর ফেরত দিলেই হবে। এমনটাই ছিল চুক্তি কিন্তু বন্দরের কাজ যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তখন কোম্পানিটি টাকা পরিষদের জন্য চাপাচাপি শুরু করলো শ্রীলংকা সরকারকে। শ্রীলংকার তখন একশো দশ কোটি ডলার ঋণ পরিষদের সামর্থ্য নেই. তখন চীন সরকার এলো মঞ্চে. তারা দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করল. কি সেই মধ্যস্থতা?
চীনের সেই কোম্পানিটি নিরানব্বই বছরের জন্য হাম্বাণ্টোটা বন্দরের মালিকানা পাবে। অর্থাৎ শ্রীলংকা সরকার ঋণের বদলি হিসেবে হাম্বানডোটা বন্দরকে নিরানব্বই বছরের জন্য লিজ দেবে চায়না মার্চের স্পোর্ট কোল্ড ড্রিঙ্কসের নেতৃত্বাধীন একটি ভেঞ্চার কোম্পানির কাছে । শ্রীলঙ্কার শহর শ্রীলংকার বন্দর অথচ সেটার মালিক হয়ে গেলো চীন । কৌশলটা দেখলেন নাম্বার ওয়ান হবার পথে চিন যে শুধু আঙুল সোজা করেই হাঁটছে তা কিন্তু দরকারে আঙুল বাঁকাও করছে। কেনিয়া থেকে মিয়ানমারে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে সমালোচনা হয়েছে তার উজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছে হাম্বানডোটা বন্দর টি। বিশ্বের দরিদ্র অর্থনীতিগুলোকে ঋণ ফাঁদে আটকানো হচ্ছে এরকম অভিযোগ রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে। এই যে চীন বিভিন্ন দেশকে কোটি কোটি ডলার অর্থ সহায়তা দেয় । চীনের অর্থায়নে ব্রিজ, ক্যালভাট সেতু কিংবা বড় বড় প্রজেক্ট হয় তাতে চীনের স্বার্থ কি? সামান্য একটা সুদের পার্সেন্টেজ, মোটেও না, চীন, ঋণের জালে ফেলে এই দেশগুলোকে হাতের মুঠোয় রাখে। দখল করে । কৌশলগত দিক থেকে ভারত মহাসাগরে হাম্বান টোটা বন্দরের গুরুত্বটা কিন্তু অপরিসীম। তাই এই বন্দর দখল করতে এই ছলনার আশ্রয় নিয়েছে চীন. আগামী কয়েক বছরে এশিয়া এবং আফ্রিকার আরো একাধিক জায়গায় এমন ঘটনা কিন্তু ঘটতে পারে. চীনে ফেসবুক, গুগল বা অ্যামাজনের মতো বিশাল সব স্টার্টআপ অথবা জায়েন্ট কোম্পানি খুব বেশি নেই. নেই ওয়াল স্ট্রিটের মতো ইকোনমিক জোন. কিন্তু বিলিয়নারের সংখ্যায় আমেরিকাকে চোখ রাঙাচ্ছে তারাও. চল্লিশের দশকে পৃথিবী বিশ্ব যুদ্ধ দেখেছে. ষাট আর সত্তরের দশকে দেখেছে কোল্ড ওয়ার. আর এখন চলছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ প্রযুক্তির যুদ্ধ, যে এগিয়ে থাকবে সেই জয়ী. সেই দৌড়ে চীন লিড নিয়ে নিয়েছে ইতিমধ্যেই পিছিয়ে পড়েছে আমেরিকা.
সৌভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুনিয়ার বুকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা ঘটে চলেছে বেশ নিরবে. যেই ঘটনাটা আজ থেকে বিশ তিরিশ বছর পর হয়তো ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে. আমেরিকাকে হটিয়ে সুপার জায়েন্ট হয়ে চীনের আত্মপ্রকাশ হিসেবে. আমরা হয়তো ভীষণ ভাগ্যবান পৃথিবীর ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ পালাবদলের সাক্ষী হতে পেরেছি. সেই জন্যই.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন