মানুষের আয় না বাড়লেও জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে. দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে মানিয়ে নিতে না পারার অন্যতম কারণ হলো মুদ্রাস্ফীতি। মুদ্রাস্ফীতিএবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে অর্থনীতির যে কয়েকটি বিষয়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত. তার মধ্যে অন্যতম হলো খেলাপিঋণ.কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পণ্য বা সেবার দাম টাকার অংকে বেড়ে গেলে অর্থনীতির ভাষায় তাকে মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়.
সাধারণত মুদ্রাস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়. ফলে কোনো একটি পণ্যের দাম আগে যদি হতো একশো টাকা. তাহলে মুদ্রাস্ফীতির পর তার দাম হবে একশো দশ টাকা. অথবা একশো টাকায় সেই পণ্য আগের চেয়ে অনেক কম পরিমাণে পাওয়া যাবে. এর ফলে অর্থনীতিতে পণ্যের আসল বিনিময় মূল্যও কমে যায়। আরো সহজ করে বলতে গেলে দেশের সর্বমোট যত সম্পদ আছে তার মূল্য ওই দেশের বর্তমান মোট মুদ্রামান বা মোট টাকার সমান.
মনে করুন বাংলাদেশে সর্বমোট একশো টাকা আছে. এবং দেশের মোট সম্পদ হলো দশটি আম. যেহেতু দেশের মোট সম্পদের মূল্য মোট মূল্যবানের সমান. সেহেতু এই দশটি আমের মূল্য একশো টাকা. তার মানে প্রতিটি আমের মূল্য দশ টাকা. এখন যদি আরো পঞ্চাশ টাকা ছাপানো হয়. মোট মুদ্রামান হয়ে যাবে একশো যোগ পঞ্চাশ বা দেড়শো টাকা. আম কিন্তু আগের সেই দশটাই আছে. কিন্তু টাকা বেড়েছে. এখন নতুন করে পঞ্চাশ টাকা ছাপানোর পর দশটি আমের মোট মূল্য হয়ে গেল দেড়শো টাকা. প্রতিটি আমের বর্তমান মূল্য পনেরো টাকা. যা আগে ছিল দশ টাকা. সম্পদ না বাড়িয়ে অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর ফলে আমের দাম দশ টাকা থেকে পনেরো টাকা হয়ে গেল. এটাই সহজ ভাষায় মুদ্রাস্ফীতি । একই একই পণ্য আগের থেকে বেশি দামে ক্রয় করা মানেই মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে. মুদ্রাস্ফীতির পেছনে বহু কারণ থাকলেও সহজ ভাষায় বলা যায়, দেশের সম্পদের পরিমাণ না বাড়িয়ে টাকা ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি হয়. মুদ্রাস্ফীতির পেছনে বহু অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত থাকে. তার মধ্যে অন্যতম হলো খেলাপিঋণ.
অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খেলাপিঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ. ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করলে সেই ঋণকে খেলাপিঋণ বলা হয়. মনে করুন বাংলাদেশের একশো টাকা থেকে এক ব্যাক্তি বিশ টাকা ঋণ নিয়েছে. যতক্ষণ পর্যন্ত ঋণের বিশ টাকা দেশের মধ্যে থাকবে ততক্ষণ দেশের মোট মুদ্রামান একশো টাকায় থাকবে. তার মানে প্রতিটি আমের মূল্য দশ টাকায় থাকবে. কিন্তু ওই ব্যক্তি যদি ঋণের বিশ টাকা ডলারে কনভার্ট করে বিদেশে গিয়ে খরচ করে ফেলে এবং সে ঋণ পরিশোধ করতে না পারে. তাহলে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হয়. প্রথমত ডলারে কনভার্ট করার কারণে ওই বিশ টাকা এখন আর বাংলাদেশের মধ্যে নেই. অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের হিসেবে বাংলাদেশের মোট টাকা এখনো একশোই আছে. কিন্তু প্রকৃত পক্ষে টাকা আছে আশি টাকা. ওই খেলাপি বিশ টাকার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার আবার বিশ টাকা অতিরিক্ত ছাপায়. অর্থাৎ ব্যাঙ্কের হিসেবে মোট মুদ্রামান হয়ে যায় একশো বিশ টাকা. কিন্তু প্রকৃত পক্ষে টাকা আছে মাত্র আশি টাকা. খেলাপিঋণ এবং দেশের টাকা বিদেশে পাচার করার কারণে কিভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয় এবার সে সম্পর্কে আলোচনা করা যাক.
যেহেতু খেলাপিঋনের কারণে নতুন করে টাকা ছাপানো হয়েছে সেহেতু মুদ্রাস্ফীতি হবে. অর্থাৎ একই আমের দাম আগে ছিল দশ টাকা. এখন হয়ে যাবে বারো টাকা. এই বিষয়টিও খুব বেশি প্রভাব ফেলতো না যদি সত্যি সত্যি দেশে একশো বিশ টাকা থাকতো. তাহলে পণ্যের দাম বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও বাড়তো. দেশে যেহেতু একশো বিশ টাকা নেই আছে আশি টাকা. তার মানে চল্লিশ টাকা দেশের অর্থনীতি থেকে হারিয়ে গেছে. এর ফলে আমাদের কাছে আছে আশি টাকা. কিন্তু পণ্য কিনতে হচ্ছে এমন দামে যেন আমাদের কাছে একশো বিশ টাকাই আছে. বাংলাদেশের bank খাতে খেলাপিঋণের পরিমান বেড়েই যাচ্ছে. বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের বিবরণী থেকে জানা যায় দুই হাজার বিশ সালের শেষের দিকে খেলাপিঋণের পরিমান ছিল চুরানব্বই হাজার চারশো চল্লিশ কোটি টাকা. দুই হাজার একুশ সালের শেষে খেলাপিঋণের পরিমান বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ একশো আটষট্টি কোটি টাকা. এক বছরের ব্যাঙ্ক গুলোতে খেলাপিঋণের ঋণ বেড়েছে পাঁচ হাজার সাতশো আঠাশ কোটি টাকা.
লক্ষ কোটি টাকারও বেশি খেলাপি দিন আমাদের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে. অথচ আমরা পণ্য ক্রয়ের সময় এমন ভাবে মূল্য পরিশোধ করছি যেন ওই এক লক্ষ একশো আটষট্টি কোটি টাকা আমাদের মুদ্রা মানে যুক্ত আছে. সে কারণেই তিনশো টাকার গরুর মাংস সাতশো টাকায় উঠে এসেছে. কিন্তু মানুষের ক্রয় ক্ষমতা এখনো সেই তিনশো টাকায় আছে. এ ছাড়া দুই হাজার নয় সাল থেকে দুই হাজার পনেরো সালের মধ্যে চার লাখ ছিয়ানব্বই হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে. সাম্প্রতিক সময়ের অর্থ পাচারের সঠিক হিসাব জানা নেই. তবে অতীতের সমীক্ষা থেকে ধারণা করা যায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় লক্ষ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হচ্ছে. বাংলাদেশের ব্যাংকাররা বলছেন দেশের নথিপত্রের খেলাপিঋণের যত দেখানো হয় প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে তিন গুণ বেশি. ঋণ আদায় না হলেও বছরের পর বছর খেলাপি করা হয় না. আবার একই ঋণ বার বার পুর্নরতফসিল করে ঋণ নিয়মিত রাখা হয়. এর ফলে খেলাপিঋণের পরিমান কম দেখায়.
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা IMF দুই হাজার উনিশ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশের ব্যাঙ্ক খাত নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল. সেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ আড়াল করে রাখা আছে. এখানে খেলাপিঋণের যে তথ্য প্রকাশ করা হয় প্রকৃত খেলাপিঋণ তার তুলনায় অনেক বেশি. আইএমএফ এর মতে বাংলাদেশে খেলাপিঋণের পরিমান হবে প্রায় আড়াই লক্ষ কোটি টাকা. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব মতে দুই হাজার সতেরো থেকে দুই হাজার একুশ. এই চার বছরে মুদ্রাস্ফীতির হার আঠাশ দশমিক সাত শতাংশ. অর্থাৎ দুই হাজার সতেরো সালে একশো টাকা দিয়ে যে পণ্য কেনা যেত দুই হাজার একুশ সালে এসে সেই পণ্য কিনতে খরচ করতে হচ্ছে প্রায় একশো একত্রিশ টাকা.
বাস্তবে মুদ্রাস্ফীতি সরকারি হিসেবের চেয়েও অনেক বেশি. কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের তথ্য মতে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যের দাম পঞ্চাশ শতাংশের বেশি বেড়েছে. মুদ্রাস্ফীতি, খেলাপিঋণ এবং দ্রব্যমূল্যের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে. কিন্তু মানুষের আয় সেইভাবে বাড়ছে না. বরং অনেক ক্ষেত্রেই আয় কমেছে. করোনা মহামারীর কারণে গত দুই বছরে অনেক মধ্যবিত্ত চাকরি হারিয়েছে. যাদের চাকরি আছে তাদেরও দুই বছর ধরে বেতন বাড়ে নি. বরং মহামারীর অজুহাতে কারো কারো বেতনের তিরিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ কমেছে. অথবা বেতন বকেয়া রেখে দিয়েছে মালিকপক্ষ. অনেক মধ্যবিত্তই এখন নিম্ন মধ্যবিত্তের কাতারে চলে এসেছে. বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাব খুব কমই পড়েছে. একটি দেশের মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে অন্যতম উদাহরণ শ্রীলংকা. শ্রীলংকার পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং জ্বালানি তেল কেনার মতো টাকাও নেই সরকারের কাছে. তার উপর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ তো আছেই. অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর বেপরোয়া ঋণ গ্রহণের কারণে দেশটি আজ দেউলিয়া হবার পথে.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন