দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা চরম এক অর্থনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে. উনিশশো আটচল্লিশ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে শ্রীলঙ্কা কখনো এত দূরবস্থায় পড়েনি. এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশটি বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত.
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করার মতো বৈদেশিক মুদ্রাও নেই শ্রীলঙ্কার কাছে. সেকারণে দেশটিতে জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া. জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে হাজার হাজার মানুষ তেল সংগ্রহের জন্য লাইনে ভিড় করছে. পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রীলংকার পেট্রোল পাম্প গুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে. কাগজ আমদানি করার মতো টাকাও নেই. তাই স্কুলের পরীক্ষাও বাতিল করা হয়েছে. শ্রীলংকা গত পনেরো বছরে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে. এর মধ্যে সমুদ্র বন্দর, বিমানবন্দর, রাস্তা নির্মাণ এবং আরও নানা ধরনের প্রকল্প রয়েছে. দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বলছেন এইসব প্রকল্পের বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয়. এইসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে শ্রীলংকা বিপুল অর্থ ঋণ নিয়েছে. ঋণ নিয়ে দেদারসে অর্থ খরচ করা হলেও অনেক প্রকল্প অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক হয় নি. যে সমস্ত প্রকল্প শ্রীলঙ্কার জন্য সব চেয়ে বড় বিপদ ডেকে এনেছে. তার মধ্যে রয়েছে হাম্বান্ডোটা সমুদ্র বন্দর ও বিমানবন্দর.
হাম্বান্ডোটায় নতুন একটি এয়ারপোর্ট তৈরি করা হলেও সেটি কার্যত অব্যবহৃত রয়েছে. কারণ এয়ারলাইনস গুলো সেখানে যেতে চায় না. আরেকটি উচ্চাভিলাসী প্রকল্প হলো কলম্বো port city. সমুদ্রের মাঝে কৃত্রিম ভূমি তৈরি করে অত্যাধুনিক শহর গড়ে তোলার প্রকল্প কলম্ব port city. এই শহর দিয়ে দুবাই সিঙ্গাপুর এবং হংকংকে টেক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের. চিনের সাথে যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে শ্রীলঙ্কা. এর বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার. এবং কাজ শেষ হতে সময় লাগবে পঁচিশ বছর. কিন্তু ততদিনে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই দেখার বিষয়. ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা জুড়ে চলছে শুধুই হাহাকার. শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সমস্যা রাতারাতি তৈরি হয়নি. গত পনেরো বছর ধরে এই সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়েছে. দেশি বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ক্রমাগত ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন সরকার. গত পনেরো বছর ধরে শ্রীলংকায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ খুব একটা হয় নি. বিদেশি বিনিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন মেয়াদে থাকা সরকার ঋণ করার প্রতি মনোযোগী হয়েছে. গত এক দশকে চিনের কাছ থেকে শ্রীলঙ্কার ঋণ নিয়েছে পাঁচ বিলিয়ন ডলার. এই ঋণ দিয়ে শ্রীলঙ্কা বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করেছে. এক্ষেত্রে শুধু চিনের ঋণকে দোষারোপ করা যাবে না. চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া সহজ. তাই শ্রীলঙ্কা চীন থেকে বিপুল অর্থ ঋণ নিয়েছে. শ্রীলংকার মোট ঋণের মাত্র দশ শতাংশ নেওয়া হয়েছে চীন থেকে.
এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক, জাপান এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মুদ্রা বাজার থেকেও শ্রীলংকা বহু ঋণ নিয়েছে. এর মধ্যে অন্যতম উৎস হচ্ছে সার্বভৌম বন্ড. দুই হাজার সাত সাল থেকে দেশটির সরকার অর্থ জোগাড়ের জন্য সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করেছে. অর্থনীতিবিদরা বলছেন একটি দেশের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে এই ধরনের সার্বভৌম বন্ড বিক্রি করা হয়. আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে এ ধরনের বন্ড বিক্রি করে অর্থের জোগান দেওয়া হয়. শ্রীলংকা ঠিক সেই কাজটিই করেছে. শ্রীলংকার মোট ঋণের সাতচল্লিশ শতাংশ বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন বন্ড ইস্যু করে নেওয়া হয়েছে. কিন্তু এই অর্থ কিভাবে পরিশোধ করা হবে সে ব্যাপারে খুব একটা চিন্তা ভাবনা করা হয় নি. আন্তর্জাতিক সার্বভৌম bond বাবদ শ্রীলংকার ঋণ রয়েছে সাড়ে বারো billion মার্কিন ডলার. এছাড়া শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এবং দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও সরকার বহু ঋণ করেছে. সব মিলিয়ে চলতি বছর শ্রীলংকাকে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে. এই সাত বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ দেড় বিলিয়ন ডলার. কিন্তু চলতি বছরের শ্রীলংকা এইসব ঋণ কিছুতেই পরিশোধ করতে পারবে না. তবে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক জানিয়েছে গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড বাবদ যে ঋণ নেওয়া হয়েছে সেখান থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে. সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে পাঁচশো মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে শ্রীলঙ্কা. ফলে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে. সে কারণে দেশটি জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে পারছে না.
শ্রীলংকা একদিকে ঋণের বোঝায় জর্জরিত. অন্যদিকে দুই হাজার উনিশ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট vat এবং tax কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়. এই পদক্ষেপে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিল. ভ্যাট প্রদানের হার পনেরো শতাংশ থেকে কমিয়ে আট শতাংশে নামিয়ে আনা হয়. Vat tax কমানোর মূল কারণ ছিল অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা. কিন্তু এর কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস মহামারী শুরু হয়. আয়কর এবং ভ্যাট কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়. ফলে সরকার আরো বেশি ঋণ নিতে বাধ্য হয়. শ্রীলঙ্কায় বৈদেশিক মুদ্রার বড় যোগান আসে দেশটির পর্যটন খাপ থেকে. ।
করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে প্রায় দুই বছর পর্যটন শিল্প বন্ধ ছিল. শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসতো চীন থেকে. কিন্তু চীনে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত বিধি নিষেধ কঠোর থাকার কারণে চীন থেকে পর্যটক আসতে পারেনি. এর ফলে দেশটির পর্যটন খাতে বিপর্যয় নেমে আসে. এছাড়া মহামারীর কারণে ব্যবসা বাণিজ্য ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়. দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আর একটি বড় জায়গা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রীলংকার নাগরিকদের পাঠানোর রেমিটেন্স. কিন্তু করোনা ভাইরাস মহামারীর সময় রেমিটেন্স প্রবাহ বন্ধ থাকার কারণে শ্রীলঙ্কা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়. মহামারীর আগে পর্যটন এবং রেমিটেন্স থেকে শ্রীলঙ্কা বারো বিলিয়ন ডলার আয় করত. অর্থ উপার্জন বন্ধ হয়ে থাকলেও এই সময়ের মধ্যে শ্রীলঙ্কা সরকার বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে বাধ্য হয়. ফলে সব দিক থেকে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির উপর প্রচন্ড চাপ তৈরি হয়.
দুই হাজার উনিশ সালে কৃষি ক্ষেত্রে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয় এবং organic কৃষি বাধ্যতামূলক করা হয়. সেজন্য শ্রীলঙ্কায় সার আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়. এর ফলে কৃষি ক্ষেত্রে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তখন শ্রীলঙ্কায় চালের উৎপাদন বিশ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়. একসময় চাল উৎপাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্রীলঙ্কা বাধ্য হয়ে চারশো পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলারের চাল আমদানি করে. সেজন্য দেশটির প্রধান খাবার চালের দামও হু হু করে বাড়তে থাকে. দেশ জুড়ে একই সাথে খাদ্য ঘাটতিও প্রকট আকার ধারণ করে. তখন কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে আনার জন্য সরকার দুইশো মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়. অর্গানিক কৃষির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শ্রীলঙ্কার চা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও. চার রপ্তানি করে শ্রীলঙ্কা অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতো. সেখানেও আসে বড় ধরনের ধাক্কা. ইরানের কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ আড়াইশো মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে পারেনি শ্রীলঙ্কা. এর বিনিময়ে তারা প্রতি মাসে পাঁচ মিলিয়ন ডলারের চা ইরানে রপ্তানি করবে. এভাবে ধীরে ধীরে চা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা হবে. বিশ্লেষকেরা বলছেন অর্গানিক কৃষি চালু করার আগে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ গবেষণা করা হয় নি. সে কারণে এতে লাভের বদলে উল্টো ক্ষতি হয়েছে. বর্তমান সংকট সামাল দিতে শ্রীলংকার প্রয়োজন বৈদেশিক মুদ্রা. সেই জন্য অনেকের দ্বারস্থ হয়েছে দেশটি. চীন, ভারত ও বাংলাদেশের কাছে আরো ঋণের আবেদন করেছে শ্রীলঙ্কা. আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা IMF এর সাথেও শ্রীলঙ্কা আলোচনা করছে. IMF এর কাছ থেকে ঋণ পেতে পনেরো শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে দেশটি. বর্তমানে মার্কিন এক ডলারের বিপরীতে শ্রীলংকার অর্থের মূল্য দুইশো পঁচানব্বই রুপি. আর বাংলাদেশী এক টাকায় শ্রীলঙ্কার মুদ্রামান সাড়ে তিন রুপি. তাদের মুদ্রার মান ক্রমাগত নিচে নেমেই চলেছে. অর্থনীতিবিদরা বলছেন মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের মাধ্যমে বর্তমান সংকট থেকে শ্রীলংকা বেরিয়ে আসতে পারে. সেই জন্য দেশটির রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে. তার জন্য প্রয়োজন বৈদেশিক বিনিয়োগ. এ ছাড়া দেশটির রাজস্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আরো ভালো করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমানোর কোন বিকল্প নেই. তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন যেভাবে শ্রীলঙ্কার উপর ঋণের বোঝা চেপে বসেছে টা থেকে দেশটি খুব সহজে বেরিয়ে আসতে পারবে না.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন