Destiny two thousand limited. আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত এই নামের সাথে. দু হাজার সালে যাত্রা শুরু হয় ডেসটিনি বাংলাদেশে. মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এবং পিরামিড স্কিম এই দুটো ব্যাপারকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায় এই প্রতিষ্ঠান. সাধারণ মানুষকে লোভের ফাঁদে ফেলে বিনিয়োগের তুমুল আগ্রহী করে তোলে ডেসটিনি। নতুন গ্রাহক আনার উপর দিতে থাকে কমিশন. ব্যাংক বা যে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি লাভের সম্ভাবনা দেখে লক্ষ লক্ষ মানুষ জড়িত হয় এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে. নিজেরা বিনিয়োগ করেই থেমে থাকেনি মানুষ. কমিশনের লোভে পরিচিত বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন এক কথায় ঘাড়ে ধরে নিয়ে আসে ডেসটিনি লগিন করার জন্য. সিলভার, গোল্ড প্লাটিনাম সহ নানা রকমের বাহারি নামে ভূষিত করা হয় এইসব ইউজারকে. পরের গল্প সবার জানা টানা বারো বছর এই দেশে ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠানটি ।
শুরুর দিকে অনেকে ভালো অঙ্কের মুনাফাও পেয়েছিলেন ডেস্টিনি থেকে । ওয়ার্ড অফ মাউসের মাধ্যমে সেসব ছড়াতে থাকে। দেশজুড়ে ডেসটিনি তখন সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানের এমডি রফিকুল আমিনের জনপ্রিয়তা ও সুপারস্টারের চেয়েও একদম কম ছিল না সেই সময়. কিন্তু হাতে হাড়ি ভাঙলে একদিন. দু হাজার বারো সালে প্রকাশিত হলো ডেসটিনি ব্যবসার আড়ালে অন্ধকার দিকগুলো. পঞ্জি স্কিম মডেলে এমএলএম ব্যবসার সাথে পরিচিত হয় মানুষ ডেসটিনি মাধ্যমে. যতদিনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে নজর ডেস্টিনের উপর পড়েছে ততদিনে তারা বাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি ।সো হোয়াট দা হেল ইজ পঞ্জি স্কীমস। ডেসটিনির গল্পের বাকিটা অনেকে জানেন আর যারা জানেন না তাদের একটু পরে বলছি.
আমরা বরং আপনাদের এখন এক লোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই। তাকে ঠিক ভদ্রলোক বলা যাবে না । আর্থিক কেলেঙ্কারির জগতে চার্লস পঞ্জী নামের এই লোকটাকে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাও বলা যেতে পারে। বাঁশির সুরের জায়গায় পঞ্জি দিতেন বিনিয়োগের বিনিময়ে চড়া মুনাফার প্রস্তাব। এমন মুনাফা আর কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিলই না । তাহলে মিস্টার পনজি কিভাবে এত বেশি মুনাফা দিতেন? তিনি নিজে বা লাভ করতেন কিভাবে? গল্পটা কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং. একশো বছর পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো আপনাদের. ইটালিয়ার নাগরিক পঞ্জি তখন আমেরিকার বস্টম শহরে হইচই ফেলে দিয়েছেন। সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কোম্পানি নামে এক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তিনি । তাকে নিয়ে ওই চুইয়ের প্রধান কারণ বিনিয়োগকারীরা হামলে পড়েছেন তার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে। চার্লস পঞ্জি যেন জাদুকর পিসি সরকার তার ইন্দ্রজালে বিমোহিত হয়ে পঙ্গপালের মতো ছুটে এসেছেন সহস্র বিনিয়োগকারীরা । সেই সময় বিভিন্ন দেশের ডাক বিভাগ নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক কুপন ব্যবহার করত চিঠিপত্র বিনিময়ের জন্য। এই কুপনগুলোর স্থানীয় মুদ্রামান থাকতো এক তবে মুদ্রার বিনিময় মূল্যের ওঠানামার কারণে অনেক সময় অন্য দেশে আন্তর্জাতিক গোপনের মান বেড়ে বা কমে যেত. অর্থাৎ আমেরিকায় যে কুপনটার দাম পাঁচ ডলার সেটা হয়তো ইউরোপের কোন দেশে দুই ডলারের সমমূল্যে পাওয়া যাচ্ছে. শুরুতে চার্লস পঞ্জি ঠিক এই সুযোগটাকেই নিলেন. তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কিছু এজেন্ট নিয়োগ করলেন। যাদের দিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবে এসব কুপন কম মূল্যের মুদ্রায় কিনে নিতেন ।
ধরা যাক জেনমার্ক বা নেদারল্যান্ডে কুপনের দাম হঠাৎ কমে গেছে আর সেখান থেকে সস্তায় প্রচুর কুপন কিনে জার্মানি ইটালি বা আমেরিকায় চড়া দামে বিক্রি করতেন পনজি অথবা এসব কুপন ব্যয় বহুল ডাকটিকেটের সঙ্গে করতেন বিনিময়. এই দুই মূল্যের ব্যাবধানের কারণে বেশ মোটা একটা লাভ নিজের পকেটে ভরতেন তিনি. পঞ্জির বিজনেস মডেলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হতেন মুনাফার জন্য. সেসময় ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে বার্ষিক মুনাফা মিলতো মাত্র পাঁচ শতাংশ. সেই জায়গায় পনজির কোম্পানিতে আন্তর্জাতিক কুপন কিনলে পঞ্চাশ শতাংশ মুনাফা দেওয়ারও প্রস্তাব দেওয়া হতো. তাও আবার মাত্র পঁয়তাল্লিশ দিনে. আর নব্বই দিন লগ্নি করলে হান্ড্রেড পার্সেন্ট প্রফিট. ব্যাঙ্কের চেয়ে বিশ গুণ বেশি লাভ পাওয়া যাবে মাত্র নব্বই দিনে । লোকে ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করবে না কেন বলুন? তবে এই পর্যন্ত আইনত কোনো সমস্যা ছিল না. একসময় লোভ বাড়তে থাকলো পনজির। লোভের সঙ্গে ক্ষুর ধার বুদ্ধিমানও ছিলেন তিনি. পাঁচ ফুট দু ইঞ্চির ছোটখাটো এই মানুষটি নিজের বুদ্ধি দিয়ে মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলতে শুরু করলেন. নিজের কোম্পানিতে বিনিয়োগ ছিল খুবই কম. বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে জমা নেওয়ার অর্থই তিনি নানাভাবে পুনবন্টন করে দিতেন যাতে তারা বিশ্বাস করেন স্কিমটি সত্যিই ভালো মুনাফা করতে সক্ষম ।
ফর্মুলাটা কিন্তু খুব সহজ আজকের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ গতকালের বিনিয়োগকারীদের ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা। এদিকে মানুষজন লাভের কারণে বাড়ি ঘর বন্ধক দিয়ে পর্যন্ত টাকা ঢালে পঞ্জির ব্যবসায়. সেই টাকায় পঞ্জি বাড়ি গাড়ি কিনতে থাকেন, কাটাতে শুরু করেন. বিলাসবহুল জীবন. আর তার কাছ থেকে সুবিধা হওয়ার টাকা পেয়ে সাফাই গাইবার লোকেরও কিন্তু অভাব হয়নি. এভাবে তিনি আট মাস নিজের পকেটে ঢোকান প্রায় দেড় কোটি ডলার. পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হয় পঞ্জি স্কিমের বিবরণ নিয়ে. এরপর বিষয়টির দিকে চোখ পড়ে যায় কর্তৃপক্ষের. তারা এই অফারটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন. বের হয়ে আসেbপঞ্জির উদ্ভাবিত স্কিমটি হল অনেকটা ফাঁপা বেলুনের মতো. এতে আসলে কোনো বিনিয়োগ নেই. আছে শুধু পরের ধনে পোদ্দারই আর অন্যের টাকা মেরে খাওয়ার ধান্দা. পঞ্জির জীবনের শেষটা কেটেছে জেলে. উনিশশো বিশ সালের বারোই আগস্ট গ্রেফতার হন তিনি. তবে পঞ্জির গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয়. উনিশশো পঁচিশ সালে জামিনে বেরিয়ে আবার প্রতারণার কাজ শুরু করেন তিনি. আবারো জেলে যেতে হয় তাকে. উনিশশো চৌত্রিশ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পরে আমেরিকা থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে. নিজ দেশ ইতালিতেও একই প্রতারণার ব্যবসা করতে গিয়ে ধরা পড়েন পঞ্জির.
তারপর তিনি চলে যান ব্রাজিলে. কিন্তু ওই যে ঢেকে যেমন স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে, ঠিক তেমনি সেখানেও এই দুই নম্বরি ব্যবসা শুরু করেন পঞ্জির. শেষ জীবনটা. চরম দারিদ্র্যে কেটেছে এই প্রতারকের. নিঃস্ব অবস্থায় মারা যান তিনি. আর রেখে যান প্রতারণার এক যুগান্তকারী কৌশল আজও দেশে দেশে প্রতারকেরা এই কৌশল খাঁটিয়ে মানুষের লোভকে কাজে লাগিয়ে সর্বনাশ করছে আরো হাজার হাজার মানুষের. তখন থেকে এই ধরনের আর্থিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডকে ডাকা হয় পঞ্জি স্কিম বলে । পঞ্জি স্কিম গুলোতে আসলে কিন্তু প্রকৃত পণ্য সেবা বা ব্যবসায় কোন কাঠামোই থাকে না. থাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা কিছু মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর প্রস্তাবনা. সহজ অর্থ আয় করা লোভ থেকে বিনিয়োগকারীরা এর ফাঁদে পড় পুঁজি হারান. সাধারণ মানুষের লোভকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিবিশেষে লাভবান হওয়ার এমন পনজি স্কিমের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরনো। আধুনিক যুগের ব্যবসায় মাল্টি লেভেল মার্কেটিং হিসেবে অভিহিত করা হয়. দশ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দুইজনকে সামান্য কিছু লভ্যাংশ দিয়ে তারপর সেটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করা. যেটা ওয়ার্ল্ড স্ট্রেটের পুরখাওয়া স্টক ব্রোকার বার্নি মেড আপ করেছিলেন , ভারতে সাহারা গ্রুপ করেছে , বাংলাদেশে টেস্ট তিনি করেছে. যুবক করেছে , ইউনিপে করেছে , ফার্স্ট ইউরো করেছে, জি এস মাইনিং করেছে আর হালামুলে রিং আইডি, এসএন গ্রুপ করেছে এমনকি ইভ্যালি ধামাকা বা ই অরেঞ্জের মতো তথাকথিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গুলোও করেছে। আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ দুনিয়ার নানা প্রান্তে একটু খোঁজ নিলেই হাজারো ঘটনার খোঁজ আপনি খুব সহজেই পেয়ে যাবেন. পঞ্জি স্কিমের বিপত্তা কোথায় জানেন? এটা কিন্তু কোনো sustainable business model নয়.
আদতে এটা ব্যবসার ধরন হতেই পারে না. পারে শুধু প্রতারণার মডেল হতে. পঞ্জি স্কিম গুলো মূলত পিরামিড আকৃতির কাঠামোর হয়ে থাকে. যার একেবারে চূড়ায় থাকে মূল পরিকল্পনাকারীরা. যারা স্কিমটি শুরু করেন. এরপর থাকে প্রাথমিক সদস্যরা. প্রাথমিক সদস্যরা নতুন সদস্য সংগ্রহ করেন. যারা তাদের নিচের ধাপে থাকে এবং এভাবে সদস্য দ্বারা সদস্য সংগ্রহের প্রক্রিয় অব্যাহত থাকার মাধ্যমে উপর থেকে নিচের দিকে ছড়ানো একটি পিরামিড আকৃতির গ্রাহক অবস্থান তৈরি হয়. এজন্য অনেকে পিরামিড স্কিমও বলে থাকেন. তবে পঞ্জি স্কিমের সঙ্গে পিরামিড স্কিমের ছোটখাটো কিছু পার্থক্য কিন্তু আছে. পঞ্জি স্কিম গুলো থেকে গ্রাহকরা কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষতির শিকারই হয়ে থাকে. যেটা ডেসটিনির পঁয়তাল্লিশ লক্ষ গ্রাহক হয়েছেন. যুবক এবং ইউনিফের কয়েক লক্ষ গ্রাহক টাকা খুইয়েছেন. ইভ্যালি অরেঞ্জে বিনিয়োগ করে মাথা চাপড়াচ্ছেন হাজারো মানুষ । ঝামেলার ব্যাপার হচ্ছে পঞ্জি স্কিমে দুর্নীতি গুলো টের পাবে তো বেশ কঠিন। বেশিরভাগ সময় ভেতরের কোনো মানুষ ঘটনাটা জানালে তবেই তা প্রকাশ পায় । যখন নতুন বিনিয়োগকারীরা এতে আর অর্থ বিনিয়োগ করেন না এটি থামতে কিন্তু বাধ্য। অর্থের উৎস বা তারল্য কমে যাওয়ায় এটি আর চালানো সম্ভব হয় না. এই ব্যবসায় উদ্যোক্তা নিজের বিনিয়োগ এতো কম থাকে যে তার নিজের আখের গুছিয়েই পালিয়ে যায়. আবার অনেক সময় অনেকে মূল টাকা ফেরত পেতে তাগাদা দিতে শুরু করে আর তখনই শুরু হয় বিশৃঙ্খলা.
সব পঞ্জি স্কিমের কিন্তু কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে. অল্প বিনিয়োগে বিশাল মুনাফার আশ্বাস আয়ের প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা স্পষ্ট না করা. অতিরিক্ত ধারাবাহিক রিটার্ন, অনিবন্ধিত বিনিয়োগ , মাঝে মাঝে গোপন বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ আয় করে প্রচার করা. স্কিম সম্পর্কে যে কোন ধরনের তথ্য প্রদান এড়িয়ে চলা. প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের টাকা বিশাল মুনাফা সহ ফেরত দিয়ে তাদের আরও বিনিয়োগের প্রলুব্ধ করা. এই সবই হচ্ছে পঞ্জি স্কিমের বৈশিষ্ট্য. এখন প্রশ্ন আসবে পঞ্জি স্কিম থেকে বাঁচার উপায়টা কি? চারপাশে এত প্রতারক লোভনীয় সব অফারের জাল পেতে রেখেছে এখান থেকে সাধারণ মানুষ সতর্ক থাকবে কিভাবে? পঞ্জি স্ক্রিমের খপ্পর থেকে বাঁচতে হলে অর্থনীতিবিদ হতে হবে না. একটু কমন সেন্স থাকাটাই কিন্তু যথেষ্ট. কোথাও বিনিয়োগ করতে গেলে ঝুঁকি আর মুনাফার তুলনাটা স্পষ্টভাবে করতে হবে. কেউ আপনাকে আকাশ চুম্বি মুনাফার প্রলোভন দেখালো আর আপনি গোলে গেলেন মাখনের মতো এমনটা যেন না হয়. লোভ মানুষের ছয়টা রিপুর একটি. প্রত্যেকের ভেতরেই ধনী হওয়ার লোভ আছে. তাদের দোষের কিছু নেই. কিন্তু সেই লোভ যেন আপনার স্বাভাবিক চিন্তা চেতনা কেড়ে না নেয়। যেকোনো দেশের আইন অনুযায়ী পেশাদারি বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার লাইসেন্স থাকা বা নিবন্ধিত হওয়াটা কিন্তু প্রয়োজন. বেশিরভাগ পঞ্জি স্কিমে লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তি বা অনিবন্ধিত সংস্থাগুলো জড়িত থাকে. কাজেই খেয়াল রাখতে হবে যার ওপর টাকা লগ্নি করছেন সে বৈধভাবে ব্যবসা করছে কিনা. যে বিনিয়োগ আপনি বুঝতে পারছেন না তা এড়িয়ে চলাই ভালো. কোথাও বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগের ক্ষেত্রটা সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা থাকা উচিত. আপনি যদি অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করতে চান এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে আপনার একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকা খুবই জরুরী। নইলে আম, চালা দুটোই যাওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু খুব বেশি ।পঞ্জি স্কিমের আরেকটা মজার দিক আছে যখনই মডেলের ব্যবসা গুলো আইনের নজরে আসে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রেফতার হন নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয়. এই লোকগুলোর প্রচুর ফ্যান ফলোয়ার থাকে. এবং সেই ফ্যান ফলোয়ারদের কাছে তাদের ইমেজটা থাকে প্রায় ঈশ্বরের কাছাকাছি. এই জন্য তাঁরা এই অপরাধীদের মুক্তিরও দাবী করেন. কারণ তাঁরা ভাবেন এই লোকগুলো জেলের বাইরে থাকলে হয়তো তাঁরা তাদের লোক লগ্নি কৃত টাকা কোন না কোনদিন ফেরত পেতেও পারেন।
উনিশশো বিশ সালে চার্লস পঞ্জিকে গ্রেফতারের পরেও কিছু মানুষ অসন্তোষ জানিয়েছিল। হালামুলে এমএলএ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিছু মানুষের গ্রেপ্তারের পরেও কিন্তু কেউ কেউ বিরোধিতা করেছেন চাইলে মিলিয়ে দেখতে পারেন গোটা ব্যাপারটা। ডেসটিনি 2000 এর পরিণতিটা জানেন অনেকেই. দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা হবার পর কোম্পানিটির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা ধরা পড়েছেন. জেলেই আছেন তাদের বেশিরভাগ. কিন্তু নয় বছর পেরিয়ে গেলেও একটি টাকাও এখনো ফেরত পায়নি গ্রাহকেরা. ডেসটিনি কখনো ভুয়া গাছের মোলা দেখিয়েছে. কখনো বা বলেছে সেই গাছ ছাগলে খেয়ে ফেলেছে. মাঝখান থেকে কোটি কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে. সেগুলো ফিরিয়ে আনার কোন ব্যবস্থাও নেই. আজও লক্ষ লক্ষ গ্রাহক আশায় আছেন. একদিন হয়তো তাঁরা টাকা ফেরত পাবেন. যদিও এই আশা অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই না.
এবার আসা যাক জনপ্রিয় এবং বিতর্কিত একটা বিষয়. বাংলাদেশের আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালে কি পঞ্জিস কিংবা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং মেথরে ব্যবসা করছিল. অনেকে এটি মানতে চাইবেন না. কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইভালির বিজনেস মডেলটা পুরোপুরি পঞ্চাশ স্কিমের কাঠামোর সঙ্গে মিল রেখেই গড়ে উঠেছিল. ইভালির প্রায় অর্ধেক দামে পণ্য সরবরাহ করতো. সেই চালের টাকাটা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকেই কিন্তু গেছে প্রতিবার। কোন অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টারের ফান্ড থেকে নয়. দশ জনের কাছ থেকে পণ্যের জন্য অগ্রিম পেমেন্ট নিয়ে দুজনকে পণ্য ডেলিভারি দিতে ইভ্যালি. বাকি আটজন হন্যে হয়ে মাসের পর মাস ধরে ঘুরতেন চাতক পাখির মতো । একই সাথে ক্রেতা এবং মার্চেন্ট উভয় শ্রেণীর কাছে ইভ্যালির দেনা বেড়েছে শত শত কোটি টাকা । কারণ তাদের বিজনেস মডেলটাই ছিল পঞ্জি স্কিম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের মতো ফাঁপা এবং অবশ্যই অথর্বহীন। এমনই আরেকটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রিং আইডি. দা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার দাবি অনুযায়ী শুধু চলতি বছরের মাত্র তিন মাসে অর্থাৎ এপ্রিল মে ও জুন. এই তিন মাসে মোট তিনশো দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে তারা. নিজেদের এরা কমিউনিটি ব্যবসা বলে দাবি করলেও আদতে এটি পঞ্জি স্কিমে চালিত এমএলএ ব্যবসা. প্ল্যাটফর্মটিতে নতুন সদস্য আনতে পারলে পুরনো সদস্যদের পনেরোশো থেকে সতেরোশো টাকা দিয়ে অফার দেওয়া হয়. এভাবেই তাঁরা সদস্য বাড়ায়. ব্রোঞ্জ, গোল্ড এবং প্লাটিনাম মেম্বারশিপও কিনতে হয় তাদের কাছ থেকে. পর বিজ্ঞাপন দেখার বিনিময়ে মেলে টাকা।
সে টাকাও আবার কিন্তু ক্যাশ পাওয়া যায় না। রিং আইডি এজেন্টের কাছ থেকে ক্যাশ আউট করতে হয়। মেম্বারশিপ কেনার কিছুদিন পর থেকেই একাউন্টেও শুরু হয় ঝামেলা। একাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়। এখন মরিয়া হয়ে নিজেদের মেম্বারশিপ বিক্রির চেষ্টায় আছেন হাজার হাজার রিআইডি ইউজার। চার্লস পঞ্জি মারা গেছেন ধুঁকে ধুঁকে । কিন্তু আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ থাকার পরেও পঞ্জি স্কিমের মৃত্যু কিন্তু হয়নি বরং গত একশো বছরে এমএলএ মার্কেটিং, পিরামিড স্কিম, হাই হাই স্কিম সহ নানা নামে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ফুলে ফেঁপে উঠেছে এই ব্যবসায়িক মডেল. শুরুটা চটকদার শেষটা. হতাশার. এক লাইনে এটাই এসব ব্যবসার এক লাইন. আমাদের কাজ এসব ধান্দাবাজি থেকে সাবধান থাকা অন্যদের সাবধান করা. লাভ আর লোভের মাঝখানের দেয়ালটা খুব সরু. সেই দেয়াল বেয়ে উপরে উঠতে গিয়ে আমরা যেন অতল গহ্বরে তলিয়ে না যাই কখনো.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন